অকপট সত্য-৩
অতিরিক্ত শাসন শিশুমনে সুপ্ত বিদ্রোহ তৈরি হয়

পূর্ণা রায় ভৌমিক

 কেস স্টাডি: ৩

অনু খুব ভালো একটা কলেজে পড়ে। তার ঐ কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া পিতা-মাতা,আত্মীয়-স্বজনের জন্যে ছিলো গর্বের। বন্ধুরাও ওকে ভালো ছাত্র হিসেবে খুব ভালোবাসে। হোস্টেলে প্রায়ই গল্পের আসর বসতো, ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে বসতো একেকদিনের আসর।

প্রায় প্রতি আড্ডার পরই হারিয়ে যাওয়া জিনিস বা খোয়া যাওয়া টাকা পয়সার হদিস মেলাতে গিয়ে অনেকদিন পর রহস্য ভেদ হলো: অনুই টাকা বা বন্ধুদের মূল্যবান জিনিসগুলো নিয়ে যেতো। এক পর্যায়ে বিষয়টি প্রমাণসহ তার বাবা-মা’র সামনে এলো,বাবা-মা ভীষণ লজ্জিত ও অপমানিত হলেন।

অনুর এই আচরণের সব খেসারত দিলেন। খুব কষ্টে দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো… কতো না শাসন করলেন! কতো না খাওয়ালেন, কতো না যত্নে পড়ালেন তাহলে কেনো এমন হলো! কতো খেয়াল রাখলেন খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলতে, কখনো টাকা পয়সা বাজে খরচ করতে দেন নি, টাকা দিলেও প্রতিটা খরচের হিসাব নিয়েছেন পাই পাই করে, আড্ডায় মিশতে দেন নি, ঘড়ি ধরে সময়ের হিসাব রেখেছেন, ছেলের মতামতের ধারও ধারেন নি, যা চেয়েছে তা তো দেনই নি বরং নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা বলতেও দেন নি। সব কাজের হিসাব নিয়েছেন, ছেলের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছেন নিজে… তাহলে কোথায় ভুল ছিলো?

অনুর বাবা ছেলেকে সঠিক মানুষ গড়তে চেয়েছিলেন সত্যি। কিন্তু, মানুষ করে গড়ে তুলতে শৈশব বা কৈশোরে শিশুকে স্বাবলম্বী করতে, দায়িত্বশীল করতে তাকে যতটুকু স্বাধীনতা দেয়ার কথা ছিলো, দেয়া হয় নি, বা তার মতামতের গুরুত্বই কখনো দেয়া হয় নি। অনু তখন থেকেই পরাধীন আর নিজেকে অদায়িত্বশীল, অকর্মণ্য ভাবতে শুরু করেছিলো।

শিশুর প্রতি আমাদের করণীয় কী?

আমি মনে করি:

  • শিশুর শৈশবের গুরুত্ব অনুযায়ী বয়স অনুযায়ী তাকে কাজের দায়িত্ব দিতে হবে
  • তার কাজের মূল্যায়ন করতে হবে
  • তাকে বিশ্বাস করতে হবে, তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে
  • সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ে তাকে ছোটখাটো দায়িত্ব দেয়া উচিৎ। যেমন: শিশুকে টাকা পয়সার হিসেব শিখতে দেয়ার ছলে দশ টাকা দিয়ে পাঁচ টাকা খরচ করে,পাঁচ টাকা তার কাছেই জমা রাখতে দেয়া যায়, ক’দিন পরে আবার নিয়ে নেয়া যায়, আবার দেয়া, আবার নেয়া… তখন সে ভাববে, বাবা/মা আমাকে বিশ্বাস করছে, এই বিশ্বাস সে কখনোই ভঙ্গ করবে না। সে ভাববে আমার দায়িত্ব আছে,দায়িত্ব থেকে সরে আসা যাবে না,আমিও কিছু কাজ করতে পারি। অতিরিক্ত অবিশ্বাস, পরাধীনতা শিশুমনে সুপ্ত বিদ্রোহ তৈরি হয়, যা সুযোগ পেলেই প্রকাশ করে, তখন তার মনে, তার নিজের স্বাধীন থাকাটাই মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়, বাবা মা বা অন্যদের নিয়ে ভাবার মতো অবকাশ তার হয় না। পরিণতিতে এমন সব কান্ড ঘটে, সমাজে পিতামাতার মাথা হেট হয়ে যায়।

পূর্ণা রায় ভৌমিকপ্রধান শিক্ষক, আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সদর

শিশুর নিরাপদ চলাফেরা