অয়ন কর্মকারের ছবিতে ‘নারীরূপী এক দুর্গার গল্প’

আমরা সবাই বলে থাকি প্রত্যেক নারীর মধ্যেই মা দূর্গার বাস। কিন্তু তাদেরকে সঠিক মর্যাদা আমরা দিতে পারি না। মা দূর্গার বিভিন্ন রুপ।
দশমহাবিদ্যায় মা ধূমাবতী ও বিধবা তাই বলে কী মা ধূমাবতীকে আমরা অসম্মান করি? বিধবা হলেও তিনি মা। বিধবা দের ও অধিকার আছে সব কাজ করার। বিধবা বলে কী কোনো শুভ কাজে আসা যায় না?
সমাজে সব দূর্গা পূজিত হয় না, কোনো দূর্গা পূজিত হওয়ার আগেই হয়ে যায় তাদের বিসর্জন।
য়ন কর্মকারের ছবি এবং অভিজিৎ কুন্ডু কর্মকারের গল্পে ফুটে উঠেছে ‘নারীরূপী এক দুর্গার গল্প’। ছবির গল্পে দেখুন অয়নের ফটোগ্রাফি।

গ্রামের নাম চন্ডীপুর।গ্রামটিতে কোনো কিছুরই কমতি ছিলো না।সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা গ্রাম।সেই গ্রামের মেয়ে নিরু।
ঠাকুরের কৃপায় তার অভাব ছিলো না কোনো কিছুর।নিরু সাক্ষাত রূপে লক্ষী আর গুণে সরস্বতী।

একই গ্রামে থাকতো গরিব কৃষক অনু। সে খেটে খাওয়া যুবক ছিলো।গরিব হলেও সে সুখী ছিলো, দিন শেষে যেদিন যা জুটতো তাই দিয়ে দিন যাপন করতো।কখনো কিছুই জুটতো না,অনাহারী থাকতে হতো কিন্তু অনু এই অভাবের পরোয়া করতো না।হাসি খুশি থাকতো সব সময়।

নিরু এবং অনু ভালোবাসতো একে অপরকে।নিরু সব কিছু ছেড়ে চলে আসে তার ভালোবাসার কাছে।নিরু আসতেই বদলাতে শুরু করলো অনুর জীবন। তারা একে অপরের সাথে মিলে মিশে তৈরি করলো ছোট্ট সংসার।
সতী যেমন তার ভালোবাসার টানে সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছিলো নিরুও এখানে অনুর কাছে চলে এসেছে।

নিরুর বুদ্ধিতে সংসারে স্বচ্চলতা আনার জন্য শুরু করে পশু পালন।অনু ও তার গৃহবধুর কথা মতো কাজ করতে লাগলো। দেখতে দেখতে অভাবের দিন ঘুচতে শুরু করে।এভাবে নিরু দশভূজা দূর্গার মতো সবদিক সামলে দেয়।

নিরুর জন্য সংসার এখন প্রায় স্বচ্ছল। অনু কাজ করে যা অর্থ পায় তার কিছু অর্থ নিরু নিরুর হাতে দেয়। সেই অর্থই নিরু মাটির ভাড়ে সঞ্চয় করে। তেমনি অন্যদিকে দু-বেলা দু-মুঠো খাবারও তুলে দিচ্ছে অনুর পাতে। এ যেন মা লক্ষী ও মা অন্নপূর্ণার রূপ। একই দেহে মায়ের দুটি রূপের বহিঃপ্রকাশ।

নিরু ও অণু সুখ শান্তি ও স্বচ্ছলতা বজায় থাকার জন্য তুলশী তলায় প্রত্যেকদিন প্রদীপ ধরায়।তনিরু নারায়ণীর মতো সকল কাজে অণুকে ভালো পরামর্শ দিতে থাকে।

এভাবে চলতে লাগলো অনু নিরু সুখের সংসার।হঠাৎ নিরুর সুখের সংসারে পড়লো শনির দৃষ্টি।নিরুর জীবনে নেমে এলো কালো ছায়া।অনু মাঠে যাওয়ার পথে তাকে সাপ দংশন করে এবং সেখানেই মৃত্যু হয় অনুর।

নিরু তখনও কিছুই জানে না। সে দিব্যি আপন মনে তার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত।সকল কাজ সেরে রান্না বসাবে, রান্নার জল আনতে যায় পুকুর ঘাটে।

জল নিয়ে মনের আনন্দে সে বাড়ির পথে

পুকুর থেকে জল আনার পথে দেখলো তার স্বামীর মৃতদেহ। তার স্বামীর নিথর দেহ পড়ে আছে। এই দেখে নিরু চমকে উঠলো। মনে তোলপাড় শুরু হলো। সেদিন চলে গেলো কাঁদতে কাঁদতে।

নিরু তার স্বামীর দেহকে ভাসিয়ে ঘরের দিকে রওনা হলো। মনে থাকা শত দুঃখকে পিছে ফেলে নতুন করে নতুন ভাবে চলার জন্য শক্তি জোগায় সে। কিন্তু তার প্রতিবেশী লোকেরা এ কি বলে? ঘরে যাওয়ার পর প্রতিবেশিরা নিরুকে নানাভাবে অবজ্ঞা অপমান করতে থাকে। তাকে অপয়া,অলুক্ষুনে,কালনাগিনী বলে কথা শোনাতে থাকে।কোনো কাজে তাকে না থাকার জন্য বলা হয়। সব শুনে নিরু নিজের মনে যে আশা জুগিয়েছিল তা আবার ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেলো। নিরুর মনে আবারো নেমে আসে কালো ছায়া।

এ দুঃখ সে কোথায় রাখবে? মনের দুঃখে পুড়তে পুড়তে মা দূর্গাকে বলে – মা,মা গো! কেন কেড়ে নিলে স্বামীকে? কেন বিধবা করলে? বিধবা বলে কী ভালোভাবে বাঁচার অধিকার নেই মা? আমরা ও তো মানুষ মা। আমাদের ও তো ইচ্ছে করে বাঁচার মতো বাঁচতে। এই রকম হাজার হাজার প্রশ্ন করতে থাকে। বিধবাদের কষ্ট সে বোঝে। সে মনে মনে ভাবলো যদি বাঁচার মতো বাঁচতেই না পারি তাহলে এ জীবন রেখে কি লাভ,এ জীবন মূল্যহীন। এই ভেবে নিরু নিজেকে নদীর জলে বিসর্জন দেয়।

আই নিউজ/এসডি