আবরার আর উঠবে না!

সুমন সুপান্ত

ভাঙা কলসের ভেতর হাওয়ার গুমরে মরার শব্দ আমি হয়তো শুনেছিলাম স্বপ্নে। কিন্তু আমার ভাবতে ভীষণ ভালো লাগতো যে, ওটা অজিত দা’র ক্যান্সারাক্রান্ত বউ তার কোলের সন্তানের জন্য মাঠে পুঁতে রেখেছিলো যে ভাঙা কলস, তারই শব্দ। ভাবতে ভালো লাগতো যে আমাকে ডেকেই সে বলেছিলো সেদিন, “ঠাকুরপো, থাকলো এটা এখানে। আমি যখন থাকব না নির্মল এসে এখানে হাওয়ার শব্দ শুনবে। ও ঠিক জেনে যাবে, এ কেবল কলসিতে হাওয়া ঢুকে আটকে পড়ার শব্দ নয়, এ তার মায়ের ডাক”।
নির্মলই তো! না কি নির্ঝর ? কি নাম ছিলো ছেলেটার! না কি অন্য কোনও নাম? জিজ্ঞেস করা হয় নি। এবার দেশে গিয়ে দেখলাম বেশ বড় হয়ে গেছে। কলেজে টেলেজে পড়ে বোধহয়। সে কি কখনো যায় মাঠের ভেতর পুঁতে রাখা সেই ভাঙা কলসির কাছে? যখন তার মায়ের কথা মনে পড়ে? যখন গলার ভেতর কান্নার দলা আটকে পড়ে? গিয়ে, শুনে তার হারিয়ে যাওয়া তরুণী মা তাকে থেমে থেমে ডাকছে, নির্মল আয় বাবা আয়, আমি তোকে আদর করতে চাই?

আরিয়ান অ্যারহানকে দেখলে আমার সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ে এখন। কোনও গহীন জঙ্গল দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে আমি এমন ডাক শুনতে পাই।
ডাকছে, আমাকেই ডাকছে। “ভাই, ও ভাই”। এ স্বর আমার চেনা। অজিত দা’র বউর স্বর ছিলো এমন। আমার বোনের স্বরও এমনই ছিলো। অকালে চলে যাওয়া সব মানুষের স্বরে এক আশ্চর্য আদল থাকে। আগেভাগে পৃথিবীকে বিদায় জানানোর মতো করুণ সিক্ত সে স্বর। অসুখে পড়া মায়েদের স্বর। আমি চিনি ওটা।

এরকম অদ্ভুত সব সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। বলি, কাল রাতেও আমি দিব্যি আমার বোনের ডাক শুনেছি। তরুণ ডাক্তারের কাছে এটা মনে হয় অতি পরিচিত কোনও মনোরোগই। একটুও না ভেবে বলে, “আমরা ডাক্তারি ভাষায় এটাকে auditory hallucination বলি। ভেবো না, ঠিক হয়ে যাবে।”

মাথা নেড়ে সায় দিই। জানি তো মিথ্যে প্রবোধেরই এই পৃথিবী। মিথ্যে আশ্বাসের।

আবরারের মা এবার ডাকবে, আয় বাবা আয়। আবরার আর উঠবে না! তার ভাইয়েরা নিজেদের মিথ্যে প্রবোধ দিবে…।