আলোচনায় অসহায় প্রাণি কালোমুখ হনুমান

পুলিশ যে সাহায্য কেন্দ্র কিভাবে বুঝল হনুমান

রিপন দে : দেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা না গেলেও যশোরের কেশবপুরে মনিরামপুরে প্রায় পাঁচ শতাধিক কালোমুখ হনুমান বাস করে। বাচ্চাকে মারধোর করায় রোববার (২২ আগস্ট) কেশবপুর থানায় গিয়ে হাজির হয় হনুমানের একটি দল। সারাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে অসহায় প্রাণিগুলো।

জীবনযাপন ও আচার- আচরণ

প্রজাতিগত দিক দিয়ে হনুমানের মধ্যে কয়েকটি শ্রেণি রয়েছে। এই প্রজাতি আদিম যুগ থেকে মনুষ্য জীবনধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এদের আচার-আচরণ খাদ্যাভ্যাস, যৌন মিলন, সন্তান জন্ম সবই মনুষ্য জীবনের ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পরিবেশগত কারণে এরা আজ দুর্গম জঙ্গলের বাইরে এসে অসহায় জীবনযাপন করছে।

অসহায় হনুমানের খাবার ও আশ্রয় সংকট

মহাভারতের রামভক্ত কেশবপুরের হনুমানের বর্তমানে তেমন নেই খাবার, নেই আশ্রয়, নেই শীত নিবারণের ব্যবস্থা। প্রজনন আর গর্ভকালীন নিরাপত্তার জন্য নেই প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল। মোট কথা, তাদের নানা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থায় এসব হনুমানের বংশ বিস্তার কমতে শুরু করেছে। চাহিদা অনুযায়ী খাবার না পেয়ে তারা ক্রমেই হিংস্র হয়ে উঠছে। ফসলের ক্ষেত বা ফলবাগানে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভারতে প্রচুর পরিমাণ কালোমুখ হনুমান বসবাস করে। প্রায়ই তারা এমন কিছু কাজ করে যা অনেকটা মানুষের মত এবং অন্য প্রাণীরা তা করতে পারেনা। কথা বলতে না পারলেও এসব হনুমানের অনুভূতি শক্তি প্রায় মানুষের কাছাকাছি।

স্পর্শকাতর ও বুদ্ধিমান প্রাণি কালোমুখ হনুমান

এদে রয়েছে রাগ-অভিমান কিংবা অভিযোগ। যশোরের কেশবপুরে এমন প্রমাণ আবারও পাওয়া গেল। যদিও এর আগেও অনেকবার তারা থানায় হাজির হয়েছে বিচারের দাবিতে। এর মধ্যে মারধর করায় বাচ্চা কোলে নিয়ে রোববার একদল কালোমুখ হনুমান কেশবপুর থানায় এসে অবস্থান নেয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছিলো।

থানা পুলিশ যে সাহায্য কেন্দ্র কিভাবে বুঝল হনুমান : সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রাণি বিশেষজ্ঞরা । বন্যপ্রাণি গবেষক আদনান আজাদ আসিফ জানান, এই এলাকায় প্রচুর কালো মুখ হনুমান আছে, যা দেশের অন্য কোথাও নেই । এরা মানুষের সাথে মিশতে মিশতে মানুষের কাছাকাছি থেকে অনেক কিছু আয়ত্ব করে ফেলেছে। যদি এদের মাঝে এই গুন অন্যান্য দেশেও দেখা যায়, এরা খুবই বুদ্ধিমান। যশোরে এরা মানুষের খুব কাছেই থাকে। তাই হয়তো তারা বুঝতে পেরেছে পুলিশ মানুষের সমস্যার সমাধান করে দেয় এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করে। যে কারণে তাদের বাচ্চাকে মারধোর করলে তারা থানায় যায় । আরো চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে থানার ওসি যখন ইশারা দিয়ে বোঝালেন তিনি বিষয়টা দেখবেন তখন তারা থানা থেকে চলে আসল।

ছবি সংগৃহীত

বিলুপ্তির পথে কালোমুখ হনুমান

জানা যায়, যশোরে বেশ কিছু হনুমান থাকলেও অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গুটিকয়েক । বিরল প্রজাতির কালোমুখ হনুমান আজ মানুষের অনীহার কারণে বিলুপ্তির পথে। এদের সংরক্ষণে নেওয়া হচ্ছে না তেমন কোন উদ্যোগ। প্রকট খাদ্যাভাব, অভয়ারণ্যের অভাবে মিলনের অন্তরায় ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের কারণে কেশবপুরের হনুমানের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এখানকার স্বল্প হনুমান এখন ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের ঘরে ঢোকে, দোকান থেকে কলা রুটি নিয়ে দৌঁড় দেয়। নষ্ট করে সবজি ক্ষেত। এমনকি কলাভর্তি ট্রাকে লাফ দিয়ে ওঠে চলে যায় অন্যত্র। খাদ্যাভাবের সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি এদের নির্মমভাবে মারধর ও কষ্ট দেয়।

সরকার থেকে তাদের জন্য প্রতিদিন যে খাবার বরাদ্দ রয়েছে সেটাও ঠিকমতো দেওয়া হয়না, এমনটি অভিযোগ রয়েছে। যা দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল।

কালোমুখ হনুমানের শারীরিক গঠন ও খাদ্যাভাস ও জীবনযাপন

এই হনুমান সাধারণত লম্বায় ২৪ ইঞ্চি থেকে ৩০ ইঞ্চি এবং উচ্চতায় ১২ ইঞ্চি থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই প্রজাতির হনুমান ৫ বছর বয়স থেকে ৬ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে। এদের গড় আয়ু ২০-২৫ বছর। শারীরিক ওজন ৫-২৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। মুখের ন্যায় হাত ও পায়ের পাতা কালো। চলাফেরা করার সময় এরা লেজ উঁচু করে চলে। তবে গাছে বসলে তারা লেজ ঝুলিয়ে দেয়। কলা, পেঁপে, আম, আমড়া, সফেদা, জাম্বুরা, মূলা, বেগুন ইত্যাদি ফলমূল, শাক-সবজি গাছের মুকুল, কচিপাতা, বাদাম এবং বিস্কুট এদের প্রিয় খাদ্য।

এরা সাধারণত একজন পুরুষ হনুমানের নেতৃত্বে দলবদ্ধভাবে চলাচল করে। প্রতিটি দলে ১০-১৫ থেকে ৩০-৪০টি হনুমান থাকে। এদের প্রতিটি সদস্য দলপতির নির্দেশ মেনে চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলপতি অন্য কোন পুরুষ সদস্যকে তার দলে সহ্য করে না। যদি কোন পুরুষ হনুমান দলে ডুকে পড়ে আর সেটা দলপতি টের পেলে তাকে হত্যা করে। তাই প্রসূতি তার পুরুষ সন্তানটিকে নিয়ে দলপতির নাগালের বাইরে পালিয়ে বেড়ায়। যতদিন না সে দলপতির আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা অর্জন করে। এরা খাদ্য অন্বেষণে সারাদিন চলাফেরা করে। এরা সচরাচর উঁচু গাছপালা পরিবেষ্টিত বনে, গাছের মগডালে নিরাপদ আশ্রয়ে রাত্রিযাপন করে।

যশোরের কেশবপুরে কালোমুখ হনুমান

দেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা না গেলেও যশোরের কেশবপুরে মনিরামপুরে প্রায় ৫শতাধিক কালোমুখ হনুমান বাস করে।কেশবপুর উপজেলা পরিষদের সীমানা দেয়াল, কেশবপুরের পশু হাসপাতাল, রামচন্দ্রপুর, বক্ষকাটি, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকূল ও ভোগতী গ্রামে এদের বিচরণ বেশি।

এছাড়া মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, আদমপুর বনবিট, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা এবং পার্বত্য অঞ্চেলের বনে এদের মাঝে মাঝে দেখা যায়।