এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণ এবং প্রতিকারের উপায়

ডাঃ মো. নাজেম আর কোরেশী রাফাত

প্রথমে জানতে হবে এন্টিবায়োটিক কি?আমাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে অনেক রোগ হয়,আর যেসকল ঔষধ ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করতে পারে তাদের বলা হয় এন্টিবায়োটিক।

আর এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে সহজে বলতে গেলে । দীর্ঘদিন একজাতীয় ঔষধ ব্যাবহারের ফলে টিকে থাকার তাগিতে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের মধ্যে জেনেটিক মিউটেশন ঘটায় এবং গঠনগতভাবে পরিবর্তন ঘটিয়ে ঔষধকে অকার্যকর করে ফেলে।এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করা সেইসকল ব্যাকটেরিয়া কলোনিকে ওই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলে হয়। অর্থাৎ কোন মানুষ এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয় না, হয় তার শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হলে পরবর্তীতে অনেক ঔষধে আর কাজ হয়না ।

কেনো এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয় ?

এন্টিবায়োটিক খুব নির্দিষ্ট কিছু রোগের জন্য ব্যাবহার করার কথা থাকলেও আমাদের দেশে ইদানীং এন্টিবায়োটিক বিক্রি ও ক্রয় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।। এমবিবিএস ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই এখন এন্টিবায়োটিক সেবন করা হয়।বেশীরভাগ ক্ষেত্রে রোগের প্রয়োজনে-ই এন্টিবায়োটিক লিখে দিলেও রোগী ২/১দিনে ভালো হয়ে গেলে কোর্স শেষ করেন না। যার কারণেও অনেকসময় এর রেজিস্ট্যান্স হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা যা সংগঠিত হয়, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজিত হয়ে যায় বলে, নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে মানুষ বা পশুর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই অ্যান্টিবায়োটিকে তা সারে না, বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং এসব রোগাক্রান্ত মানুষ বা পশু অন্য কারো উপস্থিতিতে হাঁচি-কাশি প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের শরীরের আভ্যন্তরীণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়, এবং তারাও একই রকম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়।

আমাদের দেশে অনেক কারণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স -এর জন্য দায়ি। আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে ৩মাসের এলএমএফ কোর্স করে নামের আগে ডাক্তার লিখে কিছু লোক প্র্যাকটিস করছে। গ্রামের মানুষরা তাদের কাছে যাচ্ছেন আর এসকল রোগী যাতে শহরে না যায় তাই যে কোন সমস্যার জন্য ব্যাবহার হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। শুধু এলএমএফ,ডিএমএফ, পল্লী চিকিৎসকরা নয় এন্টিবায়োটিকের এই যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন ফার্মেসীরওয়ালারাও। আমি এমনও রোগী পেয়েছি যাকে প্রথম দিনের জ্বরে প্যারাসিটামল না দিয়ে দেয়া হয়েছে এন্টিবায়োটিক। অথচ একটা স্কুলের ছাত্রও জানে জ্বর হলে প্রথমে প্যারাসিটামল খাওয়া লাগে।

ভাইরাস জ্বর হলে যেখানে এন্টিবায়োটিকের কোন কাজ নেই সেখানেও পল্লীচিকিৎসকরা মুখে খাবারের এন্টিবায়োটিক দেবার পাশাপাশি দিয়ে থাকেন মেরোপেনাম নামক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইনজেকশন।
ফলপ্রসূ ব্লাড কালচার টেষ্ট করলে দেখা মিলে অধিকাংশ মামুষের ৮০-৯০শতাংশ এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। এখানে ঔষধ কোম্পানিদেরও ভুল আছে।তারা তাদের ব্যবসার জন্য পল্লী চিকিৎসক লেভেলেও এন্টিবায়োটিক প্রমোট করে থাকেন।।ইদানীং আবার অনেক কোম্পানি তাদের বোধগম্যতার জন্য বাংলা লিটারেচার বের করেছেন!

আমরা সচেতন না হলে আগামীতে ভয়াবহ এক সমস্যার সম্মুখীন হব । আমাদের অসচেতনতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন করছে।

ফার্মেসীওয়ালা থেকে শুরু করে রোগীদের মোবাইলে যদি থাকে DIMS নামক সফটওয়্যার,সেখানে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আবার মাঝে মাঝে অতি সচেতন ও স্মার্ট বাবা-মা পাওয়া যায় যারা কিনা আগের প্রেসক্রিপশন দেখে বাচ্চার বর্তমান অসুস্থতায় এন্টিবায়োটিক নিজেরাই প্রয়োগ করেন।

যেখানে এমবিবিএস/বিডিএস ছাড়া কেউ ডাক্তার নাম লিখার অনুমতি নাই সেখানে যদি টেনেটুনে মেট্রিক পাশ করে ২/৪টা ঔষধের নাম শিখে, ৩মাসের ট্রেনিং করে ফার্মেসী দিয়ে ডাক্তারী শুরু করি,আর ঔষধের যথেচ্ছ ব্যবহার করি ; এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়াটাই স্বাভাবিক।।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এভাবে হতে থাকলে আমাদের কি ক্ষতি হতে পারে?

ঢাকা মেডিকেল ও বিএসএমএমইউ-তে কিছু ডাটা আছে যেখানে অনেকেরই সকল এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছে।এভাবে চলতে থাকলে এমন এক দিন আসবে যখন কোন এন্টিবায়োটিক শরীরে কাজ করবে না, সকল এন্টিবায়োটিক-ই রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাবে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া রোগে চিকিৎসার অভাবে কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে।

তাই আসুন আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন হতে সাহায্য করি,ডাক্তার পরামর্শ ছাড় এন্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকি।।।।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে বাঁচতে কিছু ব্যপারে অবশ্যই নিজ থেকে গুরুত্ব দিতে হবে  এবং সচেতন থাকতে হবে।

আপনাকে যা করতে হবেঃ

কেবলমাত্র সার্টিফাইড চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে।

চিকিৎসককে জোর করা যাবে না অ্যান্টিবায়োটিক দিতে।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর বলে দেয়া সকল নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে।

অন্যের বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না, কিংবা নিজের অ্যান্টিবায়োটিক অন্যকে দেয়া যাবে না।

সংক্রমণ রোধে নিয়মিত হাত ধুতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে, যেখানে-সেখানে কফ-থুতু ফেলা যাবে না, পরিষ্কার রুমাল বা টিস্যুতে নাক-মুখ চেপে হাঁচি দিতে হবে, রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সংসর্গ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, নিরাপদ শারীরিক মিলন করতে হবে, ভ্যাক্সিনেশন হালনাগাদ করতে হবে।

ডাঃ মো. নাজেম আর কোরেশী রাফাত, মেডিকেল অফিসার,মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।