করোনাভাইরাস পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল

আব্দুল করিম কিম

প্রশ্ন: করোনাভাইরাস পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল?

উত্তর: করোনা ভাইরাসের আক্রমণের পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা চরম অমানবিক ছিল। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র পৃথিবীর সর্বত্র ছিল অমানবিকতার চর্চা।

মানুষের মধ্যে মানবিকতাবোধ একেবারেই ছিলো না। সবার মধ্যেই ছিল অন্যকে বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা। তাই করোনাভাইরাস পূর্বের পৃথিবীকে ‘আসরুল্লাহ ইনসানিয়াতি’ বা ‘অমানবিকতার যুগ’ বলা হয়। সেই যুগে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে মানুষ চরম উৎকর্ষতা দেখালেও মানবিক আচরণ ছিল সর্বকালের সর্বনিম্নস্থরে।

সামান্য কারণে মানুষ মানুষকে হত্যা করতো। সন্দেহের বশে গণপিটুনি দিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে সে যুগে। সামান্য খাবার চুরির অপরাধে শিশুকে পিটিয়ে মারা সাধারণ বিষয় ছিল। ক্রীতদাস প্রথা না থাকলেও মাসিক মাইনে দিয়ে বিত্তবানেরা দাসদাসী রাখতো। দাসদাসীদের সাথে শিক্ষিত লোকেরা আচরণ মধ্যযুগের চেয়েও বর্বর ছিল। নারী নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। ছয় মাসের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধাকেও সেই যুগের মানুষেরা ধর্ষণ করতো। ছাত্রের কাছে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল না।

বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সে যুগের মানুষেরা বৃদ্ধনিবাসে ফেলে আসতো। জ্যান্ত কন্যাকে কবর দেয়া না হলেও ভ্রূণ হত্যা সে যুগের প্রচলিত রীতি ছিল।

অমানবিকতার যুগে কেউ কাউকে ন্যায্য-পাওনা পরিশোধ করতো না। মালিক শ্রমিককে ঠকাতো। শ্রমিক মালিকের কাজ ঠিক ভাবে করতো না। খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ওজনে ঠকানো ব্যবসায়ীদের লাভের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে খাদ্য সংরক্ষণ করাটা মজুদদারেরা তাদের অধিকার ভাবতো। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হতো মানুষের দুষ্কালের সময়। কিছু মানুষের মানবতাবোধ এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ ও শিশু খাদ্যে ভেজাল দিতেও এরা কার্পণ্য করতো না।

সংক্রামক ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য মুখে ব্যবহার্য মাস্ক কেনার হিড়িক শুরু হলে ব্যবহৃত মাস্ক নর্দমা থেকে তুলে এনে অমানবিকতার যুগে বিক্রি করার নজীর রয়েছে।

শিক্ষক, চিকিৎসক, বিচারকদের নীতি-নৈতিকতা তলানিতে পৌঁছে ছিল। শিক্ষক ছাত্রকে নকল করতে সাহায্য করতো। চিকিৎসক সুস্থ রোগীকে অসুস্থ বানিয়ে টাকা আদায় করতো। বিচারকদের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আলোচনা হতো। অর্থ দিয়ে বিচারের রায় বদলানো যেত।

সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা সেই যুগে সমাজের মাথা ছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদে এরাই ছিল মূল নেতৃত্বে। মাদক ব্যবসা বা দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তের মালিক হয়ে রাজনীতিতে নাম লেখানো ও মন্ত্রী-এমপি হওয়া কোন ব্যাপার ছিল না। জালিয়াতি করে হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করা গেলে সমাজ সেবকের তকমা আপনা-আপনি জুটে যেতো। সে যুগের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গরা বন-নদী-জলাধার অর্থাৎ পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে শিল্পকারখানা নির্মাণ করতো। ভূ-গর্ভস্থ পানিকে রাসায়নিক বর্জ্য দিয়ে বিষাক্ত করতো।

সে যুগের মানুষেরা নিজেদের ধার্মিক হিসাবে পরিচয় দিতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। ঈশ্বরে তাঁদের অগাধ বিশ্বাস থাকলেও আচার-আচরণে ঈশ্বরকে তাঁরা বুড়ো আঙ্গুল দিয়েও পুঁছত না। ঈশ্বরের সেই সব নির্দেশ তারা মান্য করতো যা তাদের জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতো না। কর ফাঁকি দিয়ে অর্জন করা অর্থ লোক জানিয়ে দান করতো। হুন্ডির টাকায় বিত্তশালী হয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র দান করা অত্যন্ত গৌরবের কাজ ছিল। পুণ্যস্থানে বছরে একাধিকবার গমন করা ও সবাইকে তা জানানো ধর্ম পালনের অন্যতম রীতি ছিল। তবে নিজেকে ধার্মিক প্রমাণের জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি ছিলো অন্য ধর্মের মানুষ ও তার ধর্মকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা। আর এই কাজে তাদের ইন্ধন দিতো ধর্মীয় লেবাস পরা ধর্মগুরুরা। এই ধর্মগুরুরা ধর্মীয় উপদেশ প্রদানের জন্য বড় বড় সমাবেশের আয়োজন করতো। সেই সমাবেশে উপদেশ প্রদানের বিনিময়ে তারা উচ্চমূল্যের পারিশ্রমিক আদায় করতো। সেই সব সমাবেশের অধিকাংশ বক্তব্য থাকতো নারী, ভিন্ন মতাবলম্বী ও ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে। নীতি-নৈতিকতার কোন নির্দেশনাই দেয়া হতো না। তাই বিভিন্ন ধর্মের অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষা থেকে মানুষ বিচ্যুত হতে থাকে। মানুষের মধ্যে ঘৃণাবোধের চর্চা মারাত্মক পর্যায়ে চলে আসে।

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের এমন অমানবিকতাবোধ সে যুগের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতি এমন নির্দয়তার সাথে চর্চা করে যা অতীতের অনেক বর্বর যুগের চেয়েও বীভৎস। রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে প্রতিদ্বন্দ্বি রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে গণহত্যা করা, হাসপাতালে দূর নিয়ন্ত্রিত মিসাইল হামলা করে নারী ও শিশু হত্যা করা, স্কুলে বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে বোমা হামলা করে নিরপরাধ মানুষ হত্যা সেই যুগের প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। পারমানবিক অস্ত্র ও রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলা এবং সামরিক খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় নির্বাহ করা সে যুগের অধিকাংশ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল।

সেই যুগে রাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিকের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা আমোদ-প্রমোদ ও অকল্যাণকর খাতে হাজার কোটি টাকা জলের মত ব্যয় করতো। নগরের দরিদ্র মানুষের জীর্ণ বস্তি ঢেকে দিতে কারুকার্যময় দেয়াল তৈরি করা হত; যদিও সেই দেয়াল নির্মাণের টাকাতেই এসব বস্তিবাসীকে মানসম্পন্ন বসতি দেয়া যেত। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা অধিকাংশ মানুষকে অভাব-অনটনের মধ্যে রাখাতেই নিজেদের জন্য লাভজনক ভাবতেন। নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদী রাখতে হলে গরীব-কাঙ্গালের অনেক প্রয়োজন। তাই হাজার কোটি টাকা বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্য মওকুফ করে দেয়া বা ভর্তুকি দেয়া হলেও দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পঞ্চাশ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাষ্ট্র বাহবা কুড়াতো। আতশবাজির জন্য রাষ্ট্রের বড় বাজেট থাকলেও মহামারি থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য বাজেট বরাদ্দে রাষ্ট্রকে কালক্ষেপণ করতে হতো।

 লেখক: সমন্বয়ক, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।