কীভাবে এলো জুয়া এবং ক্যাসিনো?

সম্প্রতি পুলিশ এবং র‍্যাবের বেশ কিছু ক্লাবে অভিযানের পর একটি বিষয় মোটা দাগে সমালোচনায় এসেছে। আর সেটি হলো ক্যাসিনো। কারণ যতগুলো ক্লাবে এ পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়েছে প্রত্যেকটিতেই ছিলো ক্যাসিনোর সরব উপস্থিতি। আর এই ক্যাসিনোকে ঘিরেই ক্লাব গুলোতে বিরাট আকার ধারণ করেছিলো দুর্নীতি।

গত বুধবার যুবলীগের এক নেতা জি কে শামীমের ক্লাবেও ক্যাসিনোকে ঘিরে রমরমা দুর্নীতির চিত্র পেয়েছে র‍্যাব। তারপর মোহামেডান, দিলকুশাসহ চট্টগ্রামের কিছু ক্লাবেও অভিযান চালালে একই দৃশ্য দেখা যায়।
মূলত এরপর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ক্যাসিনো।

ক্যাসিনোর শুরুটা কবে?

ক্যাসিনোর সূচনা ঘাঁটলে প্রথমেই সামনে আসে জুয়া খেলা। মূলত এখনো ক্যাসিনোর প্রধান অংশই জুয়াকে ঘিরে। এই জুয়ার শুরু আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে। জুয়াকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আনতেই চালু করা হয়েছিল ক্যাসিনো। কিন্তু জুয়া নিয়ন্ত্রণে না এসে বরং এই জুয়াকে ঘিরেই চলতে থাকে ক্যাসিনোর রমরমা ব্যবসা।

জুয়ার শুরু আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য ক্যাসিনো রয়েছে। যেখানে জুয়ারিরে জুয়া খেলায় মত্ত থাকেন। বিশেষ করে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে বৃহৎ আকারে চলছে ক্যাসিনো ব্যবসা।
ক্যাসিনোর মূল গ্রাহক সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হলেও বর্তমানে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনও অল্প সময়ে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে চান।

ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যাসিনোর আগমন

প্রাচীন ক্যাসিনোর কথা বললে ইতালি ভেনিস শহরের ‘রীডোট্ট’ ক্যাসিনোর কথা সামনে আসে। জানা যায় ১৬৩৮ সালে এই ক্যাসিনোটি তৈরি করা হয়েছিলো। অবশ্য তখন খারাপ দৃষ্টিকোণ থেকে এই ক্যাসিনোটি তৈরি করা হয়নি। বরং সমাজের জ্ঞানী লোকদের পরামর্শেই এই ক্যাসিনো তৈরি করা হয়েছিলো।

১৯৩৪ সালে ইতালি ভেনিস শহরে গড়ে ওঠা ক্যাসিনো ‘রীডোট্ট। যা ১৩৪ বছর চালু থাকার পর বন্ধ হয়ে যায়

কারণ ইতালিতে কার্নিভাল সিজনে জুয়া খেলার পরিমাণ বেড়ে যেন। তাই ওই সিজনে জুয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতেই এই ক্যাসিনোট তৈরি করা হয়েছিলো।
প্রায় ১৩৪ বছর চালু থাকার পর সামাজিক অবক্ষয়ের কথা ভেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো ‘রীডোট্ট’ ক্যাসিনো।

আমেরিকার প্রথম ক্যাসিনো ‘স্যালুন্স’

অন্যদিকে বিশ্বের আরেক প্রতাপশালী দেশ আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম ক্যাসিনো ছিলো’ স্যালুন্স।‘ জানা যায় এ ক্যাসিনো বানানোর মূল কারণ ছিলো পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানো। তখন আমেরিকায় পর্যটকদের ধরে রাখতেই ক্যাসিনো চালু করা হয়।

এখানেও ক্যাসিনোর মূল আকর্ষণ ছিলো জুয়া। তবে জুয়ার পাশাপাশি এই ক্যাসিনোতে আসা গ্রাহকরা আড্ডা দেওয়া এবং মদ খাওয়ারও সুযোগ পেতেন। ফলে ইতালির ‘রীডোট্ট’ক্যাসিনোটি বন্ধ হয়ে গেলেও এটি বন্ধ হয়ে যায় নি। উলটো অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ক্যাসিনো। ধীরে ধীরে ক্যাসিনো চালু হতে থাকে সান ফ্রান্সিসকো, সেন্ট লুইস, শিকাগোর মতো শহরেও।

সরকার অনুমোদিত প্রথম ক্যাসিনো

আমেরিকার নেভাদা রাজ্যে সর্বপ্রথম ১৯৩১ সালে সরকার অনুমোদিতে ক্যাসিনো গড়ে ওঠে। বর্তমানে ক্যাসিনোর কথা বললেই শুরুতেই আসে সিন সিটি লাসভেগাসের কথা। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবথেকে বড় জুয়ার আসরটি এখানেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

এশিয়ায় মহাদেশে ক্যাসিনো

আমেরিকার পর এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্যাসিনো। বর্তমানে এশিয়ার ক্যাসিনোগুলোই রমরমা ব্যবসা করছে বলে জানা যায়। জুয়ার বড় বড় দানগুলোও এখন এশিয়ার ক্যাসিনোগুলোতেই হয়ে থাকে।

এশিয়ার মধ্যে নেপাল, ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, এসব দেশে জুয়ার আসরে এগিয়ে আছে। এসব ক্যাসিনোতে কিশোর থেকে বৃদ্ধা সব বয়সী জুয়ারিদের উপস্থিতি সরব থাকে।

কাঠমান্ডু : এশিয়ার বৃহৎ জুয়ার আসরের স্থান

এশিয়া মহাদেশের বড় বড় জুয়ার আসরগুলো বসে এভারেস্টের দেশ নেপালের কাঠমান্ডুতে। এজন্য বিশ্বে কাঠমান্ডুর আলাদা খ্যাতিও রয়েছে। আর এসব ক্যাসিনোর প্রধান গ্রাহক থাকেন পর্যটকরা। বিশ্বের নামকরা ৬টি ক্যাসিনোর অবস্থানও এই নেপালেই।

নেপাল ক্যাসিনোস, ক্যাসিনো ইন নেপাল, ক্যাসিনো সিয়াংগ্রি, ক্যাসিনো আন্না, ক্যাসিনো এভারেস্ট, ক্যাসিনো রয়েল নেপালের জনপ্রিয় ক্যাসিনো।
এসব ক্যাসিনোতে ২৪ ঘণ্টাই জুয়ার আয়োজন থাকে। জানা যায় এসব আসরে জুয়া খেলে অনেকে এক রাতেই বিপুল টাকার মালিক হয়ে যান। আবার অনেকেই ফকির হয়ে বাড়ি ফেরেন এসব আসর থেকে।

বাংলাদেশে ক্যাসিনোর যাত্রা

যেহেতু ক্যাসিনোর মূল আয়োজনে থাকে জুয়া তাই বাংলাদেশে ক্যাসিনোর যাত্রা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের থেকেও অনেক পরে শুরু হয়। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ।

ইসলাম ধর্মে আদিকাল থেকেই জুয়া এবং মদ হারাম করা হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশে কায়সিনোর যাত্রা শুরু অনেক দেরিতে। তবে দেরিতে শুরু হলেও অল্প সময়েই বাংলাদেশেও একটি মহলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ক্যাসিনো।

ঢাকার ক্যাসিনোতে র‍্যাবের অভিযান

বাংলাদেশে ঠিক কবে থেকে এই ক্যাসিনোর যাত্রা শুরু হয়ে তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাব এবং পুলিশের অভিযানে ক্যাসিনোর যে চিত্র ওঠে এসেছে তাতে বুঝা যায় খুব বেশিদিন না হলেও লোকচক্ষুর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে ক্যাসিনো ব্যবসা।

বাংলাদেশের ক্যাসিনো নিয়ে র‍্যাবের সমীক্ষা

রয়েল বে’র একটি সমীক্ষায় বাংলাদেশে প্রায় ৫০টির মতো ক্যাসিনোর অবস্থান ওঠে এসেছে। যেখানে জুয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের ক্যাসিনোগুলোর বেশির ভাগই স্পোর্টিং ক্লাব কেন্দ্রিক। সম্প্রতি অভিযানে যে ক্যাসিনোগুলো সামনে এসেছে এগুলোও ছিলো খেলার ক্লাব কেন্দ্রিক।

বাংলাদেশের ক্যাসিনোর গ্রাহক কারা?

সাধারণত ক্যাসিনোতে সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গরা গিয়ে থাকেন। অল্প বয়সী ধনীর দুলালেরাও ঢুঁ মারেন এসব ক্যাসিনোতে। তবে ক্যাসিনোতে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী গ্রাহক সংখ্যাই থাকে বেশি।

বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশের ক্যাসিনো

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ক্যাসিনোকে সরকার অনুমোদন দিলেও বাংলাদেশে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ক্যাসিনোর উপস্থিতি জানতে পেরে এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

ক্যাসিনোতে মানুষ কেন যায়?

ক্যাসিনোতে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়ে যাওয়া। কারণ ক্যাসিনো সংশ্লিষ্টরা ক্যাসিনোর পক্ষে যে গাণিতিক যুক্তি উপস্থাপন করে তা শোনার পর সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে অল্প সময়ে ধনী হবার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।

ক্যাসিনোতে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়ে যাওয়া।

কিন্তু আদতে ক্যাসিনো হচ্ছে লাখপতি থেকে ফকির হবার সবথেকে সহজ উপায়। এছাড়াও ক্যাসিনোতে অনেকেই অবসাদ দূর করার জন্য গিয়ে থাকেন। কিন্তু অবসাদ দূর করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়েন মাদকের সাথে।

বাংলাদেশে ক্যাসিনোর অনুমোদন দেওয়া উচিৎ কি না

সরকার যখন ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান থেকে ক্যাসিনোতে অভিযান চালাচ্ছে তখন একটি মহল দাবি তোলছেন বাংলাদেশে ক্যাসিনোর অনুমোদন দেওয়া উচিৎ। কিন্তু ক্যাসিনোর ইতিহাস কী বলে?

পৃথিবীর ইতিহাসে যখন থেকে ক্যাসিনো চালু হয়েছে তখন থেকে অল্প সময়ে ধনী হবার চেয়ে অল্প সময়ে অনেক ধনী ব্যক্তি ফকির হবার ঘটনাই বেশি ঘটেছে।

তাছাড়া ক্যাসিনোর ফলে সমাজে অবক্ষয় নেমে আসে। ১৬৩৮ সালে তৈরু হওয়া ইতালির সেই ‘রীডোট্ট’ নামের ক্যাসিনোটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই। কারণ ক্যাসিনোটি চালু হবার ইতালির টাকার বিরাট অংশ একটি মহলের কাছে চলে যাচ্ছিলো। যার প্রভাব হয়তো ইতালির অর্থনীতিতেও পড়তো।

আবার উন্নত যেসব বিশ্বে ক্যাসিনোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেসব দেশে ক্যাসিনোকে ঘিরে কিছু আইনও প্রণয়ন করে দেওয়া হয়েছে। ক্যাসিনো মালিকরা এই আইনের বাইরে গিয়ে ক্যাসিনো পরিচালনা করতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবিক চিত্রে প্রায় অসম্ভব।