গণ-সমাজে শ্রীদুর্গার মাতৃরূপ ও বিলুপ্ত ‘উমা সঙ্গীত’

দীপংকর মোহান্ত

আমরা মূলত মাতৃভক্তিপরায়ণ জাতি। প্রকৃতির মতো সংবেদনশীল মন নিয়ে সর্বদাই হেসে খেলে দিনযাপন করতে পারি। বেদনাকে ছাপিয়ে আনন্দই আমাদের পথ দেখায়; এনে দেয় জীবনের গতি । আবেগের বহির্প্রকাশ ঘটাই নানারূপ ছন্দ-তালে। তাই সংস্কৃতি আমাদের ধর্মের আনুষাঙ্গিক পাথেয় হতে পারে অনায়াসে। হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত দর্শন-বিশ্বাস-লোকাচার, পৌরাণিক কাহিনি, সমাজ-সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে অবিচ্ছন্ন একটা ঐক্যের বন্ধন। এই জন্য হিন্দুদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে উৎসবের আমেজ থাকে সারা বছর। যা আজ সভ্যতার ধুসর পাণ্ডুলিপির বহুমাত্রিক ভাঁজ ও বাঁকের পালবদলের মৌন কথার ইঙ্গিত দিতে পারে সহজে। কালে যাত্রায় শারদীয় দুর্গোৎসব এখন বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ও মিলনের ক্ষেত্রভূমি রচনা করেছে।

 বাঙালি ঘরের দুর্গোৎসব কিন্তু পৌরাণিক কথা ও শাস্ত্রীকে আত্মীয়করণের ভেতর দিয়ে ও বঙ্গীয় শত লোকাচারের উপাচার নিয়ে গড়ে ওঠেছে। ফলে বাঙালির পূজা-উৎসবের রয়েছে ভিন্নমাত্রা। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শ্রীদুর্গাদেবীর অসংখ্য রূপ, ধ্যাণ, কাহিনি, নাম এবং পূজা-পদ্ধতি রচিত হয়েছে। যা সমাজের দর্শনবোধের সঙ্গে আনন্দের একটা মেল বন্ধনের জন্ম দিয়েছে। পূজা আর একান্ত ধর্মীয় বিষয় হয়ে যায়নি। বিভিন্ন জাতি-বর্ণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় করেছে।এভাবে গড়ে ওঠেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মাতৃপ্রীতির বোধ।

বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে শাস্ত্রীয় শ্রীদুর্গার অনেক লৌকিক অবস্থান গড়ে ওঠেছে বহুমাত্রিক বিশ্বাসও শ্রদ্ধায়।‘গঙ্গা বর্জিত’ বাঙালির আটপৌরে ভাঙ্গা ঘরের সবচেয়ে আপন দেবী হলেন ‘উমা’ বা ‘পার্বতী’- তিনি ‘গৌরী’ হিসেবেও আমাদের অস্থি-মজ্জায় রয়েছেন। গ্রামীণ কিংবা প্রান্তিক লোকজন এই দেবীকে পুরাণ ও শাস্ত্রেয় পাতায় আটকে রাখেনি; বরং করেছে হৃদয়ের মণিহার সুখ-দুখের  কথা কওয়ার মাঙ্গলিক মাতৃচেতনার দ্যোতক হিসেবে। যার আগমন ঘটে  শরতের শুভ্রতায়। তখন বাঙালি হিন্দুরা শতদুখের মাঝে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সারা বছর তাঁর আগমনীর অপেক্ষার প্রহর গুণতে হয়। এতো আমাদের গৃহের লক্ষীকন্যা যে। আবহমানকালের মা তাঁর বিবাহিত কন্যার মুখ দেখার জন্য অপেক্ষা করেন সারা বছর ধরে। তিনি জানেন ‘পরের ঘরে’তার মেয়ে বেশি সুখে নেই। তবুও সংসারের হাল ধরে আছে। তিনি আমাদের ঘরের মেনকা কন্যা ‘উমা’। মা মেনকা তাঁর কন্যাকে দেখার ব্যাকুলতায় অস্থির হয়ে আছেন। উমা কিন্তু শরতের কাশফুলের মতো নরম, মানবীয় ও কষ্টসহিষ্ণু মেয়ে। শিউলি ফোঁটার মতো তাঁর অনুপম সৌন্দর্য রয়েছে মনের গহীনে। যা দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করতে হয়। শত প্রতিকূলতার মধ্যে দৃঢ় পদক্ষেপেতিনি সংসার চালান। ধ্বংস করতে পারেন জগৎ-সংসারের সমস্ত পাশবিকতা ও দুর্বৃত্তায়ণ। এই কাজে তাঁর জুড়ি নেই। তিনি আবার মাতৃরূপে সৃষ্টির করতে পারেন সবকিছু। নির্মল ও শাশ্বত তাঁর আদ্যাশক্তি। বাঙালিরা বহুদৃষ্টিকাণ থেকে এই দেবীকে চিন্তা করে;আরাধনা করে। আমাদের ঘরের শাশ্বতকালের সরল মনা মা। যেমন তাঁর কন্যাকে সংসার রক্ষা ও সৃষ্টির জন্য স্বামীর বাড়ি পাঠায়। আবার বছর শেষে কন্যাকে দেখার জন্য মনে আকুলি-বিকুলি করে কন্যার মনও তেমনি ছটপট করে পিত্রালয়এক নজর দেখার জন্য। সমাজতাত্তি¡ক দৃষ্টিতে এতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর প্রতি নারী শক্তির দ্রোহ ও বিজয়। আবার সৃষ্টির ধারাবাহিকতার কলতান ধ্বণি যা কখনো নিঃশেষ হবে না। এই পটভূমিকায় ‘শ্রীদুর্গা’কে আমরা মাতৃশক্তিরূপে দেখি। এই শক্তি অবিনাশী ও চিরন্তন। সাংখ্য দর্শনের ‘পুরুষ-প্রকৃতি’ তত্ত¡ দ্বারাও বিষয়টি ব্যাখ্য করা যেতে পারে। সৃষ্টিকর্তা জীবনের প্রবাহমান ঢেউ যেন অকৃপণ ভাবে একচ্ছত্রভাবে ‘নারী’র মননশীলতার হাতে তুলে দিলেন। এর বাহিরে আমাদের জীবন অচল। মাতৃশক্তির ক্রম বিবর্তনে নব-নব প্রাণ শক্তির উদ্ভব ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে। মা ও মাতৃত্বের স্বরূপ সর্বকালে একই। অন্যান্য প্রাণি ও উদ্ভিদ একইচক্রে ঘুরছে। এই কারণে আমাদের গ্রামীণ মায়েরা ‘উমা’কে উপলব্দি করেন সবচেয়ে বেশি। তাদের বৃত্তাবদ্ধ জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে ‘উমা’ বা ‘পার্বতী’র কল্পিত জীবন যুদ্ধে। বৃহৎ অর্থে এই ‘উমা’ সর্বত্রগামী শক্তি; কিন্তু সংসারবৃত্তে রক্তে-মাংসের মতো সীমিত। আজো গ্রামে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শরৎ আগমনে মহিলারা ঘর-দোয়ার পরিষ্কার করেন। পূজার তিথিতে কিছু নারী আচার পালন করতে দেখা যায়। ঘরে আলপনা সাজিয়ে পূত-পবিত্র হয়ে দেবীর ‘আসন’ করে রাখেন। আবার দশমীতে যারার বেলায়ও তেমনি করে থাকেন।

গ্রামীণ বাঙালি হিন্দুরা লোকাচারে বিশ্বাসী। তারা নিজের বোধ-বুদ্ধি দিয়ে ধর্ম-সংস্কৃতিকে আত্তিকরণ করতে পারে নিজস্ব কায়দায়। শ্রীশ্রীমার্কেণ্ডেয় পুরাণে যে চিরন্তন সৃষ্টির প্রতীক রূপে আদ্যাশক্তির প্রবাহকে ‘মহামায়া’ হিসেবে দেখনো হয়েছে তিনি সমগ্র ত্রিলোকে ধারণ করে অনাগতকালেও নিরন্তন থাকবেন। এই শক্তি-ই হিন্দু বাঙালির কাছে ঘরের মা- উমা বা পার্বতী রূপে সাদামাটা ভাবে আখ্যায়িত। স্তর বিন্যস্ত সমাজের নিম্নজীবী বাঙলিরা ‘উমা’কে হৃদয়ের গভীরে  ঠাঁই দিয়েছে। প্রতীমা, ঘট, কলা বউ, নবপত্রিকা ইত্যাদি দার্শনিক ও সমাজতাত্তি¡ক ব্যাখ্যায় কৃষি সমাজ বিকাশের স্মারক। যা আমরা গ্রহণ করেছি চিন্তা, কর্ম ও করণে।

বাঙালি কৃষি সমাজের প্রাণধন ‘উমা’ বা গৌরী সম্ভবত মধ্যযুগে সামন্তবাদি সমাজের উচ্চ কুঠিরে ‘শ্রীদুর্গা’ কাঠামোর মধ্যে নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছিলেন। প্রাচীনযুগে বহুমুখী কল্পনায় গড়া শ্রীদুর্গার নানাবিধ মূর্তি পাওয়া যায়। প্রাচীন মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত দুর্গা মূর্তির গড়ন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বিবর্ধিত পথ দিয়ে বাংলাদেশে বর্তমান দুর্গামূর্তির আদল চলছে। বুঝা যায় যে, পৌরাণির কাহিনিকে কেন্দ্র করে অনুপম মাতৃশক্তির বহুমাত্রিক অভিব্যক্তির প্রকাশ পেয়েছে মূর্তির ভঙ্গিমায়। কীকরে এক নারী-শক্তি জগৎ-সংসারের অশুভকে বিনাশ করে, প্রলয় ঘটিয়ে আবার স্বাভাবিক প্রবাহকে সঠিক রাখতে পারে।

কিন্তু  বাঙালির দুর্গোৎসবের সূচনাপর্বের সঠিক উৎসমূল পাওয়া কঠিন। তবে ঐতিহাসিকদের ধারণা ষোড়শ শতকে বর্তমান রাজশাহীর  তাহিরপুরে একজন সামন্ত রাজা কংসনারায়ণ প্রথম নয়লক্ষ টাকা খরচ করে আড়ম্বরে পূজার সূচনা করেছিলেন। পরে রাজ-পরিবার, জমিদার পরিবারের চৌকাঠ পেরিয়ে বড়-বড় অভিজাত ও ব্যবসায়িকদের মধ্যে আড়ম্ভর-পূর্ণ ও আনন্দবহ পরিবেশে দুর্গাপূজা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে। এই কয়দিন  সাধারণ প্রজারাবৃন্দ স্ব-স্ব অবস্থান বজায় রেখে বিনা বাঁধায় খাওয়া-দাওয়া ও আমোদ-ফুর্তি করতে পাতেন। কিন্তু কৃষিসমাজের পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে জন্ম নেওয়া উমা, পার্বতী বা গৌরী চেতনার ভাটা পড়েনি। তারা নিজেদের মতো করে ভাঙ্গা ঘরে দেবীকে আবাহন করেছে। ডাচ-ইংরেজ আমলে বাঙালি হিন্দুরা ব্যবসা-বাণিজ্যে টাকাকড়ি কামাই করতে লাগলে দুর্গোৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। কিন্তু এই আমোদ-ফূর্তিতে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ, আনন্দের ভাগাভাগি একটা স্তরে আটকা থাকে। তখনো বহুদা বিভক্ত হিন্দুসমাজের লোকজন পাস্পরিক কাছাকাছি আসার সুযোগ তৈরি হয়নি। অষ্টদশ শতকে নবজাগৃতির উষালগ্নে ও সমাজ সম্প্রসারণ কালে ভিন্ন সম্প্রদায়ের  লোকজন একত্রে মিলে ‘বারেয়ারি’দুর্গাপূজা শুরু করলে হিন্দু সমাজে বাস্তবিক অর্থে নতুন সামাজিকীকরণ শুরু হয় [বারোয়ারি মানে বারো জন, একাধিক, ছোটদল করে অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন কিছু লোকজন শ্রদ্ধা ও আনন্দ চিত্তে মিলেমিশে পূজার আয়োজন করেন]। এই প্রেক্ষিতে দুর্গোৎসবে আনন্দের পাশাপাশি জাত-পাত ছোঁয়াছুয়ি কমতে থাকে। মূলত তখন থেকে দুর্গাপূজার ‘গণরূপ’ লক্ষ্যনীয়।কিন্তু এই গণরূপ দীর্ঘদিন পর্যন্ত বড়-বড় শহর, এলিট শ্রেণির মধ্যে ঘুরপাক করতে থাকে। বিশের দশকে মহাত্মা গান্ধী যখন ‘হরিজন আন্দোলন’ শুরু করেন। তখন তার গণ-চরিত্র প্রকাশ পায়। তারই সংস্কারমূলক সম্প্রসারণে মফস্বলের শহর, গ্রামীণবাজারে কংগ্রেসকর্মী বা তরুণ সংস্কারকদের হাত ধরে মিলেমিশে পূজা ও খাওয়া-দাওয়ার প্রথা চালু হতে থাকে। গ্রাম সমাজ বা গ্রাম পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত পূজায় ‘গণ-সংস্কৃতি’র চরিত্র লাভ করে। তখনো প্রাচীনপন্থিদের প্রবল বাঁধার ছিল এক পংক্তিতে বসে প্রসাদ খাওয়া নিয়ে, রান্না নিয়ে।  সে অন্য ইতিহাস। ক্রমে দুর্গাপূজার সময় সকল সংস্কার  দূর করার পথ রচিত হয়। যদি  সপ্তম শতকের দুর্গোৎসবে বারোয়ারি চরিত্র বা ‘গণরূপ’ ধারণ করতো তাহলে হিন্দু সমাজ সংস্কারের মন্থির গতির আড়ষ্টতা ও রাহুর দশা অনেকটা ক্ষয় হয়ে যেত। শ্রীদুর্গা আজ আমাদের মধ্যে গণ-ভিত্তি রচনা করেছেন। এখন দরকার সামাজিক দূরত্ব আরো গুছিয়ে আনা।

আগেই বলা হয়েছে গ্রামীণ নারী সমাজের মননে স্থাপিত‘উমা’ দেবী  অনেক মানবীয় ও বাৎসল্য প্রেমের অধিকারী। সংসার জীবনে তিনি দাস্য প্রেমে উদ্বেলিত। নবীন বয়সের উমার বিবাহ হয়েছিল অধিক বয়সী রিক্ত ভোলানাথ শিবের সঙ্গে। তিনি ছিলেন রাজকন্যা। এই অসম দাম্পত্য জীবনের চাওয়া-পাওয়া, নিরন্তর সংগ্রাম-দ্ব›দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়ে জীবনকাল কাটলেও তিনি পতিব্রতার সূ²মালার গ্রন্থী কাটেননি। দেবী উমার দুঃখে-দুঃখে যাপিত-জীবনের সাথে আমাদের বাঙালি নারীর জীবন-মান ও বাস্তবতা শতভাগ যেন মিলে গিয়েছিল। সেজন্য বাঙালি মেয়েদের কাছে ‘উমা’ বিশেষ অর্থবহ।তাঁর আগমনে সমবেত মহিলারা হৃদয় নিংড়ানো আগমনী গান করেন। যা ‘উমা সঙ্গীত’ নামে পরিচিত ছিল। আজ নতুন প্রজন্মের শারদীয় উৎসবে গ্রামের মহিলাদের কণ্ঠে ‘উমা-সঙ্গীত’ গাওয়া হয় না। সেখানে ভর করতে ভিন্ন সংস্কৃতি।  সম্ভবত নারীদের ক্ষমতায়ণ, শিক্ষার প্রসার ও শহরমুখী প্রবণতার কারণে আবহমানকালের ‘উমা সঙ্গীত’ বিলুপ্তির পথ ধরেছে। সেই করুণ সুরের সাথে করুণ রসের গান দুর্গাপূজাকে অর্থবহ করে তুলতো। গানের মর্ম কথায় ছিল উমার যন্ত্রণাময় জীবনের আড়ালে নিজেদের জীবন-কথার ব্যথার বয়ান। আমাদের মায়েরা কী পুরুষকর্তার উদাসীনার মধ্যে সংসারের ঘানি টানা,  সংসার বাড়ানো ও রক্ষার কাজ সহাস্যে তুলে নেয়নি? তারা কী খায় না খায় তা কয়জন পুরুষ খেয়াল রাখেন? আজো তার কী ব্যতিক্রম আছে? ফলে উমার কাম্যতা গ্রামীণ নারীদের আমর্মে থাকবেই যতদিন না বৈষম্যের দরজা বন্ধ না হয়। ফলে উমাকেন্দ্রিক গান বয়ষ্ক নারীদের মনে বাজবেই।

এককালে বাংলা সাহিত্যে ‘উমা-সঙ্গীত’ বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছিল। এই গানগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের দৃষ্টিও কেড়ে ছিল। বিজ্ঞজনের ধারণা সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণবপ্রেমের ব্যথিত চিত্ত মতো নারীদের মধ্যে ‘উমা-সঙ্গীতে’র সৃষ্টি হয়। কিন্তু গানের রচনাকার হিসেবে পুরুষরা সামেন চলে আসেন। বৈষ্ণব গান ও উমা-সঙ্গীতের ভাব-বাণী-কথা-সুর ও বাস্তবতার  মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। লেখক মাধক ভট্টাচার্যের ভাষায়, “…এরূপ করুণ ও মধুর গীত-সাহিত্য বৈষ্ণবদের প্রেম-সঙ্গীতকেও হার মানায়।  বৈষ্ণববীয় প্রেম-সঙ্গীত ভাব-জগতের, উমা-সঙ্গীত একান্তভাবে আমাদের সাংসারিক জীবনের পট-ভূমিকায় রচিত। ” [দ্রষ্টব্য: বাংলার উমা-সঙ্গীত, যুগশক্তি, শারদীয় সংখ্যা, ১৩ আশ্বিন, ১৩৪৭ বঙ্গাব্দ (২৯ শে সেপ্টেম্বর ১৯৪০), সম্পাদক: সুবোধচন্দ্র দত্ত, শ্রীহট্ট]  মূলত লৌকিক মেনকার অল্প বয়সী  উমার জীবনের পটভূমিকায় সঙ্গীগুলো রচিত হয়েছিল। রচয়িতাকারদের মধ্যে সর্বপ্রথম যায় নাম পাওয়া তিনি হলেন কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন। সম্ভবত সতের শতকের লোক ছিলেন। পরে অনেক রচয়িতার নাম ও তাদেও ভণিতা এবং গানের বই পাওয়া গেছে। কিন্তু গ্রামীণ মহিলাদের রচিত গানগুলো সংগৃহীত হয়েছে বলে মনে হয় না। এখনো দু’একজন প্রবীণ মহিলাদের কণ্ঠে এই গান শোনা যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বার্থে উমা সঙ্গীতগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশের দাবী রাখে। এই সঙ্গীদের প্রথম অংশ হলো আগমনী গান। মধ্য হচ্ছে বিজয়া সঙ্গীত আর দশমীর দিন হলো করুণ বিদায়ী গান। গানের মধ্যে শিব-দুর্গার মান-অভিমান, অবিচার-অত্যাচার, দুর্বিসহ জীবন, শিবের ভ্রুকূটি রয়েছে।

একুশ শতকের মাতৃরূপী উমার কাম্যতা শেষ হয়ে যায়নি। বরং দুর্বৃত্তায়িত সমাজে মানব প্রগতিকে যারা ধ্বংস করছে তাদেরকে দমন করতে মাতৃজাতিকে নতুন রণনীতির কৌশল নিতে হবে। অসুররূপী দানবদের গতি রোধ না করলে অসুরিক প্রবৃত্তি ক্রমেই বিশ্ব শান্তিকে গ্রাস করবে।

দীপংকর মোহান্ত,  লেখক, গবেষক