গহের আলীর তালসম্রাজ্য: ভিক্ষা করেও ১২ হাজার বৃক্ষরোপণ

সীমান্ত দাস

ফিচার: গহের আলী। যাকে তালসম্রাজ্যের অধিপতিও বলা যায়। বার্ধ্যক্যের ভারে একেবারে কুঁকড়ে যাওয়া এই মানুষটাকে পেটের দায়ে জীবনের একটা সময় কাটাতে হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি করেও।

সেই অবস্থায়ও এক ভিষণ অদ্ভুত খেয়াল চাপে কুঁকড়ে যাওয়া কঙ্কলসার দেহের বৃদ্ধ গহেরের মনে। তার এলাকায় সবসময় যে রাস্তায় তিনি হেঁটে বেড়ান, যে রাস্তাগুলো ছাড়া গ্রামে প্রবেশই করা যায়না সেই রাস্তার দুপাশে তিনি গাছ লাগাবেন। তার বৃক্ষরোপনের ফলে হয়তো সেই রাস্তার পথিক এক মুহুর্ত বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাবে ছায়াতলে।

বৃদ্ধ গহের আলী

তালসম্রাজ্যের সূচনা

মনের খেয়াল তো ভালোই, কিন্তু তার অর্থনৈতিক অবস্থা তার এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো কাঁটা হয়ে। যিনি ভিক্ষাবৃত্তি করে পেট চালান, তিনি গাছের চারা কেনার টাকা পাবেন কোথায়?

কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তি দমে যেতে দেয়নি বৃদ্ধ গহের আলীকে। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরতে থাকেন। খুঁজতে লাগলেন তালের আঁটি। সংগ্রহ করা সেই আঁটিগুলো বৃদ্ধের স্নেহের সাথে চারাগাছের রূপ নিলো রাস্তার দু’পাশে।

গহের আলীর তালসম্রাজ্য

শুধু রাস্তার দু’পাশেই না! রাস্তার পাশ ছাড়াও স্থানীয় গোরস্থানেও তিনি শুরু করলেন এই বৃক্ষরোপণ। এটুকুই ছিলো গহের আলীর তালসম্রাজ্যের সূচনা।

সেই সম্রাজ্যে চোখে পড়তো রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে চলাচল করা প্রত্যেক পথিকের। সড়কের দু’পাশে তার লাগানো ১২ হাজার তালগাছ ছায়াবিলাতে থাকে ক্লান্ত পথিকের উদ্দেশ্যে। আর সেইসাথে যেন পালটে গেলো সড়কের চেহারাটাও।

জীবনযাপন

তাল-সম্রাজ্যের অধিপতি গহের আলীর জন্ম ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার শিকারপুর গ্রামে। পেশায় তিনি ছিলেন দিনমজুর। বয়সকালে যখন কায়িক শ্রমের কাজ তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে তখন তাকে বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি। ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ১০৮ বছর বয়সে তাকে ফিরে যেতে হয়েছে গোরস্তানে তারই তৈরি করা তালের ছায়ায়।

জীবনের শেষের দিকে যখন মিডিয়ায় চলে আসে গহের আলীর মহান উদ্যোগের কথা, তখন তিনি একবার বিটিভির জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ইত্যাদি’-তেও ডাক পেয়েছিলেন।

স্বীকৃতি

২০০৯ সালে বৃদ্ধ গহের আলী পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদক। স্বীকৃতি পাবার পর অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি তিনি। গহের আলীর এমন কর্মকান্ডে সাদা মনের মানুষের জন্য ইয়াছিন আলী নামের এক ব্যক্তি এটিএন বাংলায় আবেদন করলে সরকার সহ সকলের দৃষ্টি পড়ে তার মহান কর্মকান্ডের দিকে। তবে গহের আলী কখনোই নিজের স্বীকৃতি দাবি করেননি।

২০০৯ সালে গহের আলী তার বৃক্ষরোপণের ফলে পেয়েছিলেন ‘জাতীয় পরিবেশ পদক’

গহের আলীর সম্রাজ্যের পতন

২০১৭ সালের ৭ আগস্টে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার খবর অনুযায়ী, গহের আলীর তালসম্রাজ্যের সন্তানসম সেই গাছগুলোতে লাগে কুঠারের আঘাত। কারণ তখন চলছিলো রাস্তার সম্প্রসারণ কাজ।

কিন্তু তারপরও কিছু গাছ রেহাই পেয়ে যায় সেই কুঠারের আঘাত থেকে। হয়তো তার ছায়ায় এখনো আশ্রয় নিচ্ছেন গহের আলী মতোই কোনো এক পথিক। তালসম্রাজ্যের অধিপতি, ভিক্ষাবৃত্তি করেও যিনি কোটি মানুষের থেকে বড় মনের অধিকারী, সেই দিনমজুর গহের আলীর জন্য রইলো শ্রদ্ধা।


সূত্রঃ গুগল, বাংলা উইকিপিডিয়া, Roar Bangla

সীমান্ত দাস/আইনিউজ