জীবন দর্শনের আলোকে দুর্গোৎসব

আহমদ সিরাজ

সাকারধর্মী সম্প্রদায়ের মাঝে কম-বেশি প্রতীক বা পুজার প্রচলন স্মরণাতীত কাল থেকে চলে আসছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্য, গ্রীক, মিশর, ভারতসহ মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ সমূহে মূর্তি ও প্রতীক পুজার ইতিহাস পাওয়া যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, প্রতীক ও মূর্তি পূজা প্রায় বিশ হাজার বছর পূর্বেও চলেছিল। যা চীন ও উত্তর আমোরিকার প্রাচীন মনুষ্য জাতির মাঝে ব্যবহৃত স্তম্ভ-টুটেম হিসাবে পরবর্তী বিবর্তনেও দেখা যায়। এর সুত্র ধরে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারোর লোথাল অঞ্চলে প্রতœতাত্মিক খননে প্রতীক বা মূর্তি পুজার নির্দশন পাওয়া গেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে সনাতন হিন্দু ধর্মে সবচেয়ে বেশি প্রতীক, মূর্তি কিংবা প্রতিমার ব্যবহার করা হয়েছে। বৈদিক যুগের গোড়ার দিকে এগারজন কওে তেত্রিশ জন দেবতার নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামকরণের ক্ষেত্রে স্ত্রী, পুরুষ ভেদ করা হয়নি। তা শক্তিবাচক হিসাবেই চিহ্নিত রয়েছে। তখন কেবলমাত্র ‘সূর্য’ এর নামকরণ করা হয়েছে উষা-বিষ্ণু, মিত্র, ল²ী, সরস্বতী ইত্যাদি হিসাবে। যেমন- শক্তি হিসাবে ইন্দ্র, বরুণ, রুদ্র, শিব ইত্যাদি। এসব শক্তির অধিকারী দেবতারা তখন বিভিন্ন আসন ও মুদ্রায় চিহ্নিত হয়েছেন, যেমন-ব্যাঘ্রাসন, সিংহ আসন ইত্যাদি।

দুই
উল্লেখিত প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় দুর্গাপুজা বা দুর্গোৎসব এর আলোকপাত করা যেতে পারে। প্রকৃতি রাজ্যে সুর্য শক্তি হিাসবে প্রাধান্য পাওয়াতে সুর্যই প্রধান দেবতা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন। প্রাতঃকালে সুর্য, সরস্বতী, মধ্যাহ্নকালে দুর্গা ও সায়ংকালীন সময়ে সূর্য লক্ষী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। মূলত এ ত্রি-শক্তি একই শক্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপ হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে। প্রাচীনকালে মানুষের জীবন ও প্রকৃতির শক্তির নানামুখী বৈচিত্র্যকেন্দ্রিক হওয়ায় তার প্রভাব-শক্তি মানুষ লৌকিক ধারণার বাইরে অলৌকিক শক্তি দ্বারাই তাড়িত হয়েছে।
জীবনের এমন অসহায়ত্ব ভয়াল বিপদ সংকুল পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রধান বিবেচ্য হওয়ায় প্রকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ছিল কঠিন। প্রকৃতির এসব মহা-মহা শক্তি সমূহ মানুষের জীবনের আরাধ্য হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। মানুষ পুজা অর্চনা, সাধনার মধ্য দিয়ে বিরুদ্ধ শক্তিকে পরাস্ত করতে সচেষ্ট হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মানুষের কাছে শুভ-অশুভ শক্তি চিহ্নিত হয়েছে। তাই অতীতের দেব দেবীর রাজ্যে পুজা অর্চনায় শক্তির নির্দশন হিসাবে বাহুবল ও অস্ত্রবল দ্বারা পরাক্রান্ত শক্তির মোকাবেলা করা হয়েছে। এখানে কাহিনীতে আছে যে, একদা স্বর্গের দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে রাজ্যহারা হন। তখন দেবতারা ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে সঙ্গে নিয়ে মহেশ্বরের নিকট তাদের দুর্দশার বিবরণ জানালে তার তৃতীয় নয়ন থেকে জ্যোতিনির্গত হলে অপরাপর দেবতার শরীর থেকেও জ্যোতি নির্গত হয়; যা একত্রিত হয়ে দিগন্তব্যাপী পর্বতের আকার নেয়। যা নারী রূপী দুর্গা হিসাবে আর্ভিভূত হয়। মনোহারিণী এই নারী মূর্তিতে মহিষাষুর আকৃষ্ট হয়ে তাকে করায়ত্ব করতে দিক বেদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে উঠে। তাকে পেতে অস্ত্রবল ও বাহুবল দ্বারা ঝাপিয়ে পড়তে উদ্ধত হলে, দেবী দুর্গার ত্রিশুলের আঘাতে তার মৃত্যুঘটে। অতঃপর দেবতারা তাদের রাজ্য ফিরে পেতে সক্ষম হন। এই হল কাহিনীর সংক্ষিপ্ত সার।
কলিকা পূরাণে দুর্গা তিনবার মহিষাসুর বধ করেন বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু দেবী দুর্গার এই আধ্যাত্মিক কাহিনির পাশাপাশি সমাজ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্গাকে অনার্য দেবতাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নিহাররঞ্জন রায়Ñ শিব ও বিভিন্ন হিন্দু ও বৌদ্ধ দেব-দেবীকে অনার্য গ্রাম্য বলে রায় দিয়েছেন। শীতলা, কালী, মনসা ইত্যাদির প্রভাব লক্ষনীয়। আমাদের জানা ভালো পৃথিবীতে এক সময় নারী প্রাধান্য ছিল-অর্থাৎ সমস্ত কিছুই মাতৃকা দেবীকে আর্বতিত করে পরিচালিত হয়েছে। উপাখ্যানে আছে যে, দেবী দুর্গা শুক্লা পঞ্চমীতে অনগ্রসর, হাঁড়ি, ডোম, চÐাল প্রভৃতির পুজা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া রুদ্র শিব এর চরিত্র যেভাবে বহুতর সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষিত হয়েছে, তেমনি শ্রীদুর্গার বৈচিত্র্যেময় বিবর্তনে অনার্যকৃষ্টির প্রভাব বিশেষষজ্ঞগণ লক্ষ করেছেন। সমাজ বিকাশের ধারায় সমাজে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তেমনি দেবতা রাজ্যের উত্থান ও পতন ঘটেছে। একটা সময় দেবতা ও মানুষ প্রকৃতি রাজ্যে কাছাকাছি অবস্থানে প্রভাবিত অবস্থানে থাকলেও কালান্তরে দূরে চলে গেছে।

তিন
সমাজ রূপান্তর, বিকাশের এই ধারায় পুজা অর্চনা ইত্যাদি সমাজয়াতনে ইহ জাগতিক বিবেচনায় গুরুত্ব লাভ করেছে। শারদীয় দুর্গোৎসব শরৎ ও বসন্তকালে অনুষ্ঠানের নিয়ম থাকলেও স্থান কাল ভৌগলিক পরিবেশ বিবেচনায় মাত্রা বেঁধে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুর্গাপুজা মুর্তি বা প্রতীক আকারে একটা সাকারধর্মী উৎসব হলেও তার বাস্তব ভিত্তি হচ্ছে মাতৃশক্তির বন্দনা- যে শক্তি পাশবিকতাকে রোধ করতে পারে, নতুনের বার্তা দেয়। এই সাকারের মধ্যে চেতনা বা ভাবের আরোপ করা হয়েছে। ভাব-বস্তুর মধ্যে দিয়ে সাকার নিরাকারের সেতু বন্ধন যেন।

চার
দুর্গাপুজা অনুষ্ঠানে বিরাট আলোড়ন থাকলেও এক সময়ে এই পুজা কেবলমাত্র বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে নির্দিষ্ট ছিল। জমিদাররা বিশেষত এই পুজার আয়োজন করলেও তাতে সাধারণের অবাধ প্রবেশের সুযোগ ছিল না। এই পুজায় শুভ ও অশুভ শক্তির গুরুত্ব থাকায় ক্রমশ সমাজ বাস্তবতায় সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ে পুজার সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। ধনী, নির্ধন নির্বিশেষে এখন এই পুজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতে এই পুজা বিরাট আড়ম্বরে জনতার অংশ হয়ে উঠেছে। দুর্গা পুজার সামাজিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বোঝার সুযোগ নেই। জড় ও চেতনের সমন্বিত অবস্থানের মধ্যে দিয়ে পুজার মাহাত্ম্য জনচিত্তে ও সনাতন হিন্দু সমাজে প্রতিভাত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত দার্শনিক ড. জিসি দেবের ‘আমার জীবন দর্শন’ গ্রন্থ থেকে একটা উদ্ধৃতি টানা যেতে পারে,-

‘ইন্দ্রিয়ানুভূতির সঙ্গে আধ্যাত্মানুভুতির একটা রফা নিষ্পপ্তি করতে পারলেই সমঞ্জসী আধ্যাত্মবাদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সে সমন্বয়ে জড় চেতনের দ্বন্ধ থাকবে না। তা যেমন চেতনে জড়ের সত্তা দেখতে পারে, তেমনি জড়ের ভেতরেও চেতনের শাশ্বত প্রকার দেখতে পাবে, কাজেই আধুনিক জড়বাদ ও প্রাচীন আধ্যাত্মবাদ এ দুইয়ের সমঝতার ভিত্তিতে মানুষের ভাবী প্রগতির সার্বিক কল্যানের ইমারত গড়ে তুলতে হবে। (পৃষ্ঠা-৩৩)

অধুনাবস্তুবাদী যারা, সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে সামাজিক, দার্শানিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তারাও জানেন জগত বস্তুময় এবং বস্তুর একটা ভাব-চেতনার দিক আছে। বস্তু পূর্বগামী হয়ে বস্তুর ভেতর দিয়ে পরিসমাপ্তির দিকে চলে। শারদীয় দুর্গোৎসব এর কাঠামোটি যেন পূর্বগামী তাতে ভাব বা আইডিয়া স্থাপনের মধ্যে দিয়ে সমাজয়াতনেও অসুর নিধনের মহড়াই পালিত হচ্ছে।

পুরানের সুর-অসুর লড়াইয়ে যে ত্রিশুল ব্যবহার করা হয়েছে, এখন জগতের সুর অসুর লড়াইয়ে আধুনিক যে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তা সমস্ত জগতকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিতে পারে। একটা মানবিক দৃষ্টি অক্ষুন্ন রেখে একালের বা সমকালের অসুর নিধন হবে দার্শনিক ভিত্তি।

শারদীয় দুর্গোৎসব এর মহা আয়োজনের মধ্যে জগতের মঙ্গল, অমঙ্গল অর্থাৎ সুর ও অসুর এ বার্তাটি এভাবেই হয়তো বুঝে নেওয়া উত্তম হবে।

সহায়ক গ্রন্থ: হংস নারায়ণ ভট্টচার্য্য, হিন্দুদের দেব-দেবী, কলকাতা।

আহমদ সিরাজ, লেখক, গবেষক