পাঁচগাঁওয়ে লালবর্ণে পূজিত জাগ্রত দেবী

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রায় ৩২৩ বছর আগের কথা। স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাশ আসামের কামাখ্যাধামে কুমারী পুজার দেওয়ার মানত করেন। ছুটে যান দেবীর টানে কামাখ্যাধাম। উপাসনায় মগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। কেটে যায় ছয়টি ঘন্টা। পুজা শেষে দেখতে পান কুমারী লালবর্ণ আকার ধারণ করেছেন। ‘দেবী আমার পুজা কি পূর্ণ হয়েছে’- জানতে চান সর্বানন্দ। তখন দেবী খুশি হয়ে বলেন, ‘তোর পুজা পূর্ণ হয়েছে। আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। বর (উপহার) হিসাবে এখন থেকে তোর গ্রামের বাড়ী পাঁচগাঁও পুজা মন্ডপে আমি লালবর্ণ ধারণ করে জাগ্রত অবস্থায় হাজির হব।’ সেই থেকে শুরু।

প্রতি বছর মৌলভীবাজারের রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে জাগ্রত অবস্থায় হাজির হন দেবী। পুজিত হন লাল বর্ণে। লাখো মানুষের ঢল নামে। সর্বানন্দ দাশের বাড়িতে প্রায় তিন’শ বছর ধরে বংশ পরস্পরায় পালিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গা পুজা। বললেন- পাঁচগাঁও পুজা মন্ডপের আয়োজক স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাশের উত্তরাধিকারী সঞ্জয় দাশ। আর এটা উপমহাদেশের একমাত্র ও ব্যতিক্রমী পুজা মন্ডপ বলে জানান তিনি।

ভক্তদের ভিড়

লাল বর্ণের দেবী মূর্তি দেশের আর কোথাও নেই। যে কারণে এই প্রতিমার কাছে ভক্তদের অনেক আশা-আকাঙ্খা। পুরাণ অনুযায়ী দেবী দূর্গার লাল রূপকে দেবী কাত্তায়নী, ষষ্ঠ অবতার দেব দুর্গার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেবী দুর্গার রূদ্র রূপকে প্রতিফলিত করে লাল রং। এ থেকে অনেকের ধারণা লাল রঙা দূর্গা দেবী জাগ্রত। রয়েছে আলাদা শক্তি। চাইলেই পাওয়া যায় বর।

সঞ্জয় দাশ বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া প্রায় তিনশত বছর ধরে এখানে এ পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করেন পূজার সময়। প্রতিবছর এখানে লোকসমাগম বেড়েই চলেছে। তাদের সামাল দিতে মাঝেমধ্যে হিমশিম খেতে হয়। এরপরও এখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার ও রাজনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার উত্তরে পাঁচগাঁও গ্রাম। পাঁচগাঁওয়ে জাগ্রত দেবীর পুজা মন্ডপে যেতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে হাজারো মানুষের ভিড়। যেন চেনা পথে চেনা উৎসব। দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে ছুটছে দেবীর কাছে। দেশ বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজন নানা মানত নিয়ে আর একটু পূণ্যের আশায় লালদুর্গাকে ভক্তি দিচ্ছেন। কেউবা আগুনের কুন্ডলীতে অঞ্জলি দিচ্ছেন।

পুজা কমিটির নেতা সুব্রত ধর পার্থ জানান, প্রতি বছর এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পূণ্যার্থীরা পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাকে দর্শন করার জন্য দুর্বার আকর্ষনে ছুটে আসেন। শুধু দেশ নয়, দেশর বাইরে ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকেও ভক্তরা লাল দুর্গায় পুজা দিতে এসে মানতসহ অঞ্জলি দেন। এবারও ভারত থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থীরা পুজা দিতে এসেছেন।

পাঁচগাঁও লাল দুর্গায় স্থানীয় সংসদ সদস্য নেছার আহমদ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা

পূর্ণার্থী সুপ্রিয়া নন্দী জানান, অন্যান্য দুর্গা থেকে এই দুর্গা আলাদা। তিনি জাগ্রত দেবী। তাঁর কাছে কোন কিছু মানত করে ভক্তি দিলে সে আশা পূরণ হয়। তাই প্রতি বছর এখানে এসে ভক্তি দিয়ে যান। ছোট্ট শিশু মোহান্ত সিংহ জানায়, লালদুর্গা আমার জন্য বর দিবে। তাই আমি দেবীর কাছে এসেছি। অমলেন্দু সিংহ বলেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি লালদুর্গাকে পুজা দিতে। দেবীর ডাক তো আর ফেরানো যায়না। কলকাতা থেকে আসা উমা ভট্টাচার্য্য বলেন, উপমহাদেশের মধ্যে আর কোন মন্ডপে লালদুর্গা নেই। এই দুর্গা অন্যান্য দুর্গা থেকে আলাদা। এখানো পুজা দিতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার। তাই তিনি কলকাতা থেকে ছুটে এসেছেন মা-দেবীর কাছে প্রার্থণা করতে।

গ্রত দেবী লাল দুর্গাকে পূজা দিতে ভারতের কৈলাশহর থেকে পাঁচগাঁওয়ের পুজা মন্ডপে এসেছেন উর্মি ভট্টাচার্য্য। সাথে পুরো পরিবার। তিনি জানান যে কেউ মানত করে দেবীকে পুজা দিলে তার মানসা পুরণ হয়। দশমীর দিনে দেবীকে বিসর্জন দিতে বেজে উঠবে বিদায়ের সুর। লাখো ভক্তদের চোখের জলে বিদায় নিবেন দেবী লাল দুর্গা।

মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুন্না রায় বলেন, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় পূজা হয় পাঁচগাঁও গ্রামে। কারণ সেখানে স্বয়ং দুর্গার আবির্ভাব হয়। এজন্য ভক্তদের উপস্থিতিও থাকে বেশি। এবার পুরো জেলায় সর্বজনীন ৮৬০টি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৩৮টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনসহ সরকার সার্বিকভাবে আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে।