‘পিগমি’ : পৃথিবীর সবচাইতে খাটো মানবসম্প্রদায়

হেলাল আহমেদ

পৃথিবীতে একজন মানুষের স্বাভাবিক শারিরীক উচ্চতা প্রায় ১৭২ সেমি (৫ ফুট ৭ ১/২ ইঞ্চি) এবং বিশ্বব্যাপী বয়স্ক মেয়েদের গড় উচ্চতা প্রায় ১৫৮ সেন্টিমিটার (৫ ফুট ২ ইঞ্চি)। কিন্তু পৃথিবীর বুকে এমন একটি মানবজাতি বা গোষ্ঠী আছে যারা এই স্বাভাবিক উচ্চতার ধারে কাছেও নেই। তাদেরকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচাইতে খাটো মানুষ। ‘অদ্ভুত’ এই মানব গোষ্ঠীর নাম ‘পিগমি’। আজকের ফিচারে জানাবো এই ‘পিগমি’ জাতি সম্পর্কে।

পিগমিরা মূলত মধ্য আফ্রিকার একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। যারা খাটো বলে বিশেষভাবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে এই পিগমিরাই  আফ্রিকার আদিমতম জাতিগোষ্ঠী। যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু কিছু জায়গায়ও এদের অস্তিত্ব ছিল। ফিলিপাইনের ইয়েতা আদিবাসীরাও মূলত পিগমি মানব গোষ্ঠীরই অন্তর্ভুক্ত।

খ্রীস্টপূর্ব ২২৫০ সালের একটি চিঠিতে সর্বপ্রথম এই পিগমিদের উল্লেখ পাওয়া যায়।

পিগমিরা বামনাকৃতির জঙ্গলবাসী একটি সুপ্রাচীন মানবসম্প্রদায়। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে ধীরে ধীরে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছ এই জাতি। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে পিগমিদের সংখ্যা ১ লক্ষের বেশি হবে না। সুতরাং,বুঝাই যাচ্ছে পৃথিবীতে এই পিগমিরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কিভাবে লড়াই করে যাচ্ছে।

আফ্রিকার পিগমিদের সঙ্গে ইউরোপীয় অভিযাত্রী

লেখার শুরুতেই পৃথিবীব্যাপী মানুষের গড় উচ্চতার কথা বলেছিলাম। বিশ্ব জুড়ে মানুষের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি হলেও এই পিগমিদের শারিরীক উচ্চতা সর্বোচ্চ সাড়ে চার ফুট। পিগমিদের শারিরীক উচ্চতার কারণে অনেক সময় কে বাচ্চা আর কে প্রাপ্তবয়স্ক তা বুঝে ওঠাই কষ্টকর হয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, পিগমিদের এ খর্বাকৃতির কারণ হলো, শরীরের উচ্চতা বাড়ানোর জন্য যে ইনসুলিন জাতীয় আইজিএফ নামের উপাদানটি কাজ করে, পিগমিদের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। এ কারণেই এরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা খাটো বা বামুন হয়ে থাকে।

যেহেতু পিগমিদের শারিরীক উচ্চতা অত্যন্ত খাটো তাই তাদের ঘরবাড়িও হয় ছোট ছোট। এই পিগমিরা কিন্তু যাযাবর সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এরা এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। ছোট ছোট দলে এরা একজনের নেতৃত্বে জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এবং কিছুদিন অবস্থান করে আবার জায়গা পরিবর্তন করে।

মজার ব্যাপার হলো সারা পৃথিবীর মানুষ যে তাদেরকে ‘পিগমি’ নামে ডাকে তা এই মানুষগুলো জানেই না! কারণ সভ্য জগতের সাথে এদের কোনো যোগাযোগ নেই। তারা নিজেদেরকে ‘বা’ হিসেবেই জানে। এই ‘বা’ শব্দটির মানে হচ্ছে মানুষ।

পিগমিরা যেহেতু জঙ্গলে থাকে তাই তাদের খাবারের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন জাতের বুনোফল। তবে ফলমূল ছাড়াও সকল ধরনের চতুষ্পদী প্রাণী তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। খাবার সংগ্রহের জন্য এই পিগমিরা শিকার করে বেড়ায়।

আধুনিক বিশ্বে শিকারের জন্য নানা ধরনের আধুনিক হাতিয়ার তৈরি হলেও পিগমিরা এখনো আদিম উপায়েই শিকার করে বেড়ায়। এখনো তারা গাছের ডাল, কাঠ, পাথরের ফলা দিয়ে নিজেদের তৈরি হাতিয়ার দিয়ে বন্যপ্রাণী শিকার করে।

পিগমিরা সবচেয়ে পছন্দ করেন ‘বল্লু ডুকার’ নামে এক ধরনের ছোট হরিণ। পিগমিরা শিকার ধরে জালে আটকে। এই জাল তৈরি করা হয় এনকুসা নামে এক ধরনের দৃঢ় গুল্ম দিয়ে। ফলে জালগুলো হয় খুবই শক্ত। পশু শিকারের সময় তারা কোমর সমান করে জালগুলো পেতে ছোট কাঠের টুকরা দিয়ে নিচগুলো ভালো করে আটকে তারপর শিকারকে তাড়িয়ে জালে এনে আটক করেন। শিকার যদি হাতি বা ওই ধরনের বড় আকৃতির কিছু হয়, তবে জালবন্দি অবস্থায় তীর মেরে দুর্বল করে দেওয়া হয়।

New Scientist Default Image

শিকার নিয়ে তারা দলবেঁধে গ্রামে ফেরে। এ সময় পিগমি নারীরা দলবেঁধে নাচে। তাদের বিশ্বাস, গর্ভাবস্থায় কোনো মহিলার সামনে এ শিকার ও শিকার-পরবর্তী উৎসব সৌভাগ্যের প্রতীক।

পিগমি জাতিগোষ্ঠীরও দলনেতা থাকে আর এ দলনেতা নির্বাচিত হয় কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। দলনেতাকে তুখোড় শিকারি হতে হয়। এদের কয়েকটি উপজাতি হলো বাকা, মুবুতি এবং নিগ্রিতো। ক্যামেরুন, কঙ্গো এবং গ্যাবনের জঙ্গলে বাকা উপজাতির বাস। কঙ্গোতে মুবুতি প্রজাতির প্রায় ৩০-৪০ হাজার পিগমি আছে।

জঙ্গলে বসবাস করার ফলে সভ্য জগতের অনেকেই এই পিগমিদেরকে ‘বন মানুষ’ বলে অভিহিত করলেও আদতে পিগমিরা ‘বন মানুষ’ নয়। বরং তারা আমাদের মতোই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। মানুষ তাদেরকে যতোটা হিংস্র ভাবে তারা ততোটা হিংস্র নয়। যুদ্ধ কিংবা বিবাদ পিগমিদের অভিধানে নেই বললেই চলে। এমনকি তারা নিজেদের মধ্যেও কোনো ধরনের ঝগড়া বিবাদে জড়ান না।

হেলাল আহমেদ, ডেস্ক প্রতিবেদক, আইনিউজ

আগামীকাল পড়ুন ‘টাইটানিক কি সত্যি ডুবেছিলো?’