বারমুডা ট্রায়াঙ্গল : আটলান্টিকের রহস্য না রূপকথা?

হেলাল আহমেদ

আটলান্টিক মহাসাগরের ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে’র কথা শোনেন নি এমন কাউকে আজকাল খুঁজে পাওয়া যাবে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের কাছেই এক রহস্যময় এক জায়গা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’। শোনা যায়, এই ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে’র উপর দিয়ে কোনো উড়োজাহাজ উড়ে গেলে সেটি হুট করেই উধাও হয়ে যায়! শুধু আকাশপথ থেকে উড়োজাহাজই যে উধাও হয়ে যায় তা না। এই এলাকা দিয়ে কোনো জাহাজ গেলেও নাকি উধাও হয়ে যায়। অনেক বাহন এ পর্যন্ত উধাও হয়ে গেছে। আর এসব উধাও হয়ে যাবার পেছনে স্থানীয়রা দায়ী করছেন অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে। তাদের ধারণা রহস্যময় এই জায়গায় রয়েছে অতিপ্রাকৃতিক কোন শক্তি বা ভিনগ্রহের কোন প্রাণীর উপস্থিতি।

এতোসব ঘটনার কারণে ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ বিশ্বের মানুষের কাছে এক রহস্য। যেই রহস্য সমাধানে কাজ করেছেন বিজ্ঞানীরাও। পেয়েছেন সহজ স্বাভাবিক সমাধান। যেই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে এতো কথা-উপকথা আজকে জানাবো সেই রহস্যময় জায়গা সম্পর্কে।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল আসলে আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাংশে ত্রিভুজাকৃতির একটি বিশেষ অঞ্চল। এর এক কোণে বারমুডা দ্বীপ আর অন্য দুই প্রান্তে মায়ামি বিচ ও পুয়ের্তে রিকোর সান জুয়ান।

এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল সম্পর্কে সর্বপ্রথম যার লেখা থেকে জানা যায় তিনি হলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস। ১৪৯২ সালে তিনি তার একটি বইয়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে লিখেন। সেখানে তিনি জায়গাটিতে তার অভিজ্ঞতার কথা এভাবে বর্ণনা দেন-

“The land was first seen by a sailor (Rodrigo de Triana), although the Admiral at ten o’clock that evening standing on the quarter-deck saw a light, but so small a body that he could not affirm it to be land; calling to Pero Gutiérrez, groom of the King’s wardrobe, he told him he saw a light, and bid him look that way, which he did and saw it; he did the same to Rodrigo Sánchez of Segovia, whom the King and Queen had sent with the squadron as comptroller, but he was unable to see it from his situation. The Admiral again perceived it once or twice, appearing like the light of a wax candle moving up and down, which some thought an indication of land. But the Admiral held it for certain that land was near…”

কলাম্বাস তার বইয়ের একটি জায়গায় লিখেন- তার জাহাজের নাবিকেরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচানাচি, আকাশে ধোঁয়া দেখেছেন। এছাড়া তিনি এখানে কম্পাসের উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশনার কথাও বর্ণনা করেছেন।’

অবশ্য তার এই বর্ণনাগুলোর সমাধানও বের করেছেন বর্তমানের বিশেষজ্ঞরা। তাদের সমাধানে বেরিয়ে এসেছে যে, আসলে কলাম্বাসের জাহাজের নাবিকরা যেই আলো দেখেছিলেন সেটি ছিলো মূলত সেখানকার স্থানীয়দের রান্না-বান্নার জন্য জ্বালানো আগুনের আলো। আর ভৌগোলিকগত কারণে পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই যেহেতু কম্পাস উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশনা দেয় সেহেতু বারমুডা ট্রায়াঙ্গলেও যদি এরকম কিছু ঘটে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মজার বিষয় হলো বারমুডা রহস্যের এই সহজ সমাধান তখন অনেকেই গ্রহণ করেন নি। বরং বারমুডাকে আরও রহস্যময় জায়গা হিসেবে গড়ে তোলতে থাকেন সেসময়ের লেখকরাও। বর্তমানেও অনেক লেখক আছেন যারা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে ঘিরে রূপকথা লিখছেন। যেখানে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে একটি অভিশপ্ত জায়গা লিখা হয়।

সে যাইহোক, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল সম্পর্কে ভালোভাবে মানুষ জানতে পারে ১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাঁচটি টিভিএম অ্যাভেঞ্জার উড়োজাহাজ এবং একটি উদ্ধারকারী উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনার পর। তখন থেকে এই জায়গাটিতে আরও  অনেক জাহাজ-উড়োজাহাজ নিখোঁজ প্রায়শই হচ্ছিলো। তাই জায়গাটি সম্পর্কে একদিকে মানুষের জানার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।  অন্যদিকে জায়গাটিকে ঘিরে তৈরি হতে থাকে নানা ধরনের রূপকথা। কেউ কেউ এই জায়গাটিকে শয়তানের ত্রিভুজ বলে অভিহিত করতে থাকে।

কিন্তু সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা এই জায়গাটিতে একাধিকবার পরীক্ষা চালিয়েও অতিপ্রাকৃত কিছু পান নি। বরং তাদের কাছে মনে হয়েছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে উধাও হয়ে যাওয়ার যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক। এর পেছনে অদৃশ্য কিছুর হাত আছে এমন কিছুই সেখানে পান নি তারা।

তবে বিজ্ঞানীরা কিছু না পেলেও কী হবে? মানুষের এই জায়গাকে ঘিরে রহস্য দিনদিন বেড়েই চলেছে। অনেকে এখনো জায়গাটিতে ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির জায়গা বলে মনে করেন। কেউ কেউ তো এটাও মনে করেন যে এখানে এলিয়েনদের আসা যাতায়াত রয়েছে!

মানুষ যতোকিছুই বলুক আধুনিক বিজ্ঞান এটা প্রমাণ করে দিয়েছে যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে আসলে কোনো রহস্য নেই। যেসব রূপকথা শোনা যায় সেগুলো আমাদের মতো মানুষেরই তৈরি। কেউ কেউ এই রূপকথাগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে বেড়াচ্ছে।

হেলাল আহমেদ, ডেস্ক প্রতিবেদক, আইনিউজ

ariankoshis1998@gmail.com

এরকম আরও অনেক মজার মজার রহস্যের গল্প জানতে পড়ুন আইনিউজের ফিচার পাতা