বিজয়া দশমীতে ‘সিঁদুর খেলা’

নিজস্ব প্রতিবেদক : শারদীয় দু্র্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দেবী বন্দনা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় শেষবারের মত পূজা অর্চনা।

এরপর দেখা যায় বাঙালি হিন্দু নারীদের ঐতিহ্যবাহি “সিঁদুর খেলা”।

মৌলভীবাজার কালীমন্দিরে বিজয়া দশমীতে ‘সিঁদুর খেলা’। ছবি : রনজিৎ জনি

সকাল থেকে দেবী বন্দনায় দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপে বিষাদের সুর বাজতে শুরু করে। দিনভর চলেছে চণ্ডীপাঠ আর ভক্তদের কীর্তনবন্দনা। পূজা শেষে অশ্রুজল নয়নে ভক্তরা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার পায়ে অঞ্জলি দিয়েছে।

ছবি : রনজিৎ জনি

পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে এ বছর দুর্গা পূজার উৎসবমূখরতা সবার নজর কাড়ে। বিজয় দশমীর দুপুরে মণ্ডপে মণ্ডপে ছিলো “সিঁদুর খেলা”।

শহরের কাশিনাথ মাঠে অনুষ্ঠিত মহেশ্বরী পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অজয় রায় বলেন, বিজয়া দশমীতে উৎসব মুখর পরিবেশে হয়েছে শেষ মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকতা।

সকাল সোয়া ১০ টা থেকে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর পড়ানো হচ্য়। এরপর নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে প্রথমার্ধের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

মৌলভীবাজার কালীমন্দিরে বিজয়া দশমীতে ‘সিঁদুর খেলা’। ছবি : রনজিৎ জনি

সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে বর্ণিল সাজে পূজা মণ্ডপে হাজির হন সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণী ও দম্পতিরা।

বাঙালি হিন্দু নারীদের “সিঁদুর খেলা”

হিন্দু ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। কয়েক দিনব্যাপী এই পূজায় পালিত হয় নানা রকমের অনুষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হলো “সিঁদুর খেলা”। এই সিঁদুর খেলার দেখা মেলে শারদীয় উৎসবের বিজয়া দশমীর দিনে।

সিঁদুর খেলা হিন্দুদের রঙ খেলার থেকে কিছুটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এই খেলা কেবল বিবাহিত নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই বৈশিষ্ট্যের কারণ হলো সিঁদুর বিবাহিত নারীদের প্রতীক। তাই অবিবাহিত নারী ও বিধবাদের জন্য এ খেলার ক্ষেত্রে বিশেষ নিষেধ রয়েছে।

সিঁদুর খেলার প্রাথমিক ইতিহাস অজানা। ধারণা করা হয়, এ খেলা আনুমানিক ৪০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল, যেসময় মানুষ সবেমাত্র দুর্গাপূজা উদযাপন শুরু করে।

সিঁদুর খেলার আগে ও পরে রয়েছে কিছু নিয়ম-কানুন। বিজয়া দশমীতে মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহাআরতির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

শীতল ভোগের আয়োজন করা হয় সেদিন, যার মধ্যে থাকে কচুশাক, পান্তা ভাত এবং ইলিশ মাছ ভাজা। এরপর, পণ্ডিত পূজা শুরু করেন।

মৌলভীবাজার কালীমন্দিরে বিজয়া দশমীতে ‘সিঁদুর খেলা’। ছবি : রনজিৎ জনি

সর্বশেষ যে রীতিটি পালিত হয়, এর নাম “দেবী বরণ”। এটি শুরু হয় বিবাহিত নারীদের সিঁদুর খেলার মাধ্যমে। বিবাহিত নারীরা সিঁদুর, পান ও মিষ্টি নিয়ে দুর্গা মাকে সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। তাঁরা এই সিঁদুর মাখিয়ে দুর্গা মাকে বিদায় জানান। দুর্গাকে নিয়ে যাওয়ার আগে সিঁথিতে সিঁদুর মাখানোর পর আঙুলে লেগে থাকা বাকি সিঁদুর তারা একে অপরের মুখে মাখেন। এই সিঁদুর মাখার রীতি অনেক সময় দশমী ঘরে পালন করা হলেও অনেকে আবার নিজেদের ঘরেই খেলে থাকেন।

এই রীতির অন্যতম গুরুত্ব হলো, বিবাহিতরা তাদের সিঁদুরের স্থায়িত্ব অর্থাৎ তাদের স্বামীর দীর্ঘ জীবন কামনার উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই সিঁদুর খেলা খেলে থাকেন। এ কারণেই সম্ভবত বিধবা নারীদের এই খেলার রীতির প্রচলন নেই। কারণ বিধবারা সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারেন না।

বাঙালি হিন্দু নারীরা তাদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যবাহী কাপড় পরে দুর্গার পায়ে সিঁদুর মাখেন। এরপর নিজেদের মুখে মাখেন। তাদের স্বামীর দীর্ঘ জীবন ও সুখ-শান্তি কামনা করেন। এভাবে পালিত হয় তাঁদের সিঁদুর খেলা। আর এই খেলা হিন্দুধর্মাম্বলীদের জন্যে প্রয়োজনীয়, কারণ তাঁদের মতে জীবনসঙ্গিনীর দীর্ঘ জীবন কামনা এই পূজার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।