মমি : প্রাচীন মিশরীয়দের তৈরি বিষ্ময়গুলোর অন্যতম

ফিচার ডেস্ক: নীলনদের তীরে খ্রিস্টের জন্মের অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তার বেশির ভাগ আধুনিক যুগেও রহস্য এবং বিস্ময়ে মোড়া। আর এসব বিস্ময়ের অন্যতম হচ্ছে মমি।

তবে তার আগে এই মমি সম্বন্ধে কিছু ধারণা থাকা দরকার। আসলে মমি হচ্ছে একটি মৃতদেহ, যা জীবের শরীরের নরম কোষসমষ্টিকে জলবায়ু এবং বিশেষ দাফন প্রথাগুলো থেকে রক্ষা করে।

অন্যভাবে বলা যায়, মমি হলো একটি মৃতদেহ যা মানবিক প্রযুক্তির মধ্যে অথবা প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস এবং হ্ময়প্রাপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।

ছবি: অনলাইন

হাইরোগ্লিফিকের পাঠোদ্ধার করে জানা গিয়েছে মিশরীয়রা বিশ্বাস করত মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে। তাই তারা শব-সংরক্ষণ করত। কিন্তু কী সেই উপায়, যাতে হাজার হাজার বছর পরেও সেই শব অবিকৃত রয়েছে, তার পুরোটা এখনও অধরা।

স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যুর পরে দেহে পচন ধরতে থাকে। পচন রোধ করতে প্রয়োজন দেহের টিস্যু থেকে আর্দ্রতা ও অক্সিজেন দূর করা। সভ্যতার প্রথম দিকে মিশরীয়রা মৃতদেহ মরুভূমিতে সঙ্কীর্ণ গহ্বরে সমাধি দিত।

ফলে গরম ও শুষ্ক বালুকণায় দেহ স্বাভাবিক উপায়ে মমিতে পরিণত হত।

ছবি: অনলাইন

মিশরীয়রা বুঝেছিল, নিথর দেহ সাধারণ ভাবে শবাধারে রেখে দিলে তাতে পচন ধরবেই। তাই পচনরোধে তারা ব্যবহার করত বিশেষ প্রলেপ। তারপর প্রলেপ মাখানো দেহ মুড়ে বা ঢেকে ফেলা হত লিনেন বা বিখ্যাত মিশরীয় কটনে।

পিরামিড, মন্দির-সহ প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে যে হাইরোগ্লিফিক ফলক উদ্ধার হয়েছে, তার ভিত্তিতে কিছুটা হলেও জানা গিয়েছে মমি-রহস্য। তবে সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটন এখনও দূর অস্ত্।

মোটামুটি ভাবে জানা গিয়েছে, মমি তৈরির প্রক্রিয়ায় সময় লাগত প্রায় আড়াই মাস। প্রথমে পেটের বাঁ দিকের অংশ কেটে বার করে ফেলা হত ক্ষুদ্রান্ত, যকৃৎ, ফুসফুস এবং পাকস্থলি। দেহেই রেখে দেওয়া হতো হৃদযন্ত্র।

কারণ মিশরীয় বিশ্বাস ছিল, যাবতীয় বুদ্ধিমত্তা ও আবেগের কেন্দ্র হল হৃদয়। তাই ওই অঙ্গ রেখে দেওয়া হত শবেই।

হুকের মতো বাঁকানো যন্ত্রের মাধ্যমে নাক দিয়ে বার করে আনা হত মস্তিষ্কের যাবতীয় অংশ। কারণ ঘিলুকে মৃত্যুর পরের জীবনে রাখার প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলে মনে করত মিশরীয়রা।

ছবি: অনলাইন

বের করে নেওয়া অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও মৃতদেহটিকে নাট্রন নুনের আস্তরণে আবৃত করে রাখা হত। এই নুন সোডিয়াম কার্বনেট, সোডিয়াম বাইকার্বনেট, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম সালফেটের একটি প্রাকৃতিক যৌগ। এর ফলে আর্দ্রতার শেষ বিন্দুটিও শুকিয়ে যেত।

বিচ্ছিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলিকে লিনেনে মুড়ে সংরক্ষিত রাখা হত বিশেষ পাত্রে। প্রত্যেক আধারের ঢাকনা ছিল রাজত্ব ও আকাশের দেবতা হোরাসের চার ছেলের প্রতীক।

এই চার সন্তান হলেন ইমসেটি, যিনি শব থেকে বিচ্ছিন্ন যকৃৎকে রক্ষা করতেন। দ্বিতীয় পুত্র হাপি রক্ষা করেন মুণ্ডকে। তৃতীয় পুত্র কেবেহসেনাফ ক্ষুদ্রান্ত-রক্ষক। দুয়ামাতেফ রক্ষা করতেন পাকস্থলিকে।

ছবি: অনলাইন

৪০ দিন পরে নাট্রনের আস্তরণ সরিয়ে পরিষ্কার করা হত শব। তারপর ঘষা হত শুকনো চামড়া। প্রত্যঙ্গহীন ফাঁকা দেহের খোলসে ভরা হত বালির গুঁড়ো এবং পুরনো কাপড়ের টুকরো। দেহের যে অংশ দিয়ে বার করা হত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, সেই খোলা মুখ বন্ধ করা হত মোম দিয়ে।

এরপর কুড়ি দিন ধরে ওই দেহে মাখানো হত অন্তত কুড়িটি স্তরের প্রলেপন। সাদা লিনেনের মোড়কে ঢেকে রাখা হত প্রলেপের আস্তরণে থাকা শব। মমিকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে বুঝলে ব্যান্ডেজে আবৃত দেহ রাখা হত সুচিত্রিত শবাধারে।

যে প্রলেপের আস্তরণ শবে মাখানো হত, তার উপকরণেই লুকিয়ে রহস্য। ওই প্রলেপেই কয়েক হাজার বছর ধরে অবিকৃত রয়েছে দেহ। কিন্তু সেই উপকরণ কী কী, তা এখনও আধুনিক সভ্যতার বোঝার বাইরেই রয়ে গিয়েছে।

ছবি: অনলাইন

সূত্র: আনন্দবাজার