মিশরের অমীমাংসিত পিরামিড রহস্য

হেলাল আহমেদ

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে সুন্দর জায়গার নামটি যদি আপনাকে বলতে বলা হয় তাহলে আপনি হয়তো আপনার দেখা সুন্দর জায়গাগুলোর নাম ঠাশ করে বলে দিতে পারবেন। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীর সবচাইতে রহস্যময় জায়গা বা দেশের নাম বলতে তখন ইজিপ্ট সাম্রাজ্য বা মিশরীয় সভ্যতার কথা বলতেই।

বলা হয়ে থাকে মানবসভ্যতার ইতিহাসে মিশর এক রহস্যময় জায়গা। যেখানে রচিত হয়েছে অনেক রহস্যময় ঘটনার। আজকের ফিচারটিতে মিশর রহস্যের কিছু অংশ নিয়ে জানানোর চেষ্টা করবো।

আজকালকের কথা নয়, ইতিহাসের পাতা উলটে আমাদেরকে যেতে হবে চার হাজার বছর পূর্বে। কারণ আজকে থেকে চার বছর পূর্বে মিশরীয় সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। সেসময় তারা কিছু মনমুগ্ধকর স্থাপনা তৈরি করেছিলো। যা পরবর্তী সময়ে সমস্ত বিজ্ঞানীদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। আকাশের তারার সাথে যুগসূত্র রেখে পিরামিড তৈরি, পিরামিডের ভেতরে ন্যাচারাল এসি এসমস্ত ঘটনাবলী বিজ্ঞানীদের ঘুমকে হারাম করে দিয়েছিলো।

person walking near The Great Sphinx

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এসে অত্যাধুনিক বিভিন্ন গ্যাজেট দিয়ে এসব পিরামিডের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও এর কোনো রহস্যের জট-ই খোলতে পারেন নি বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের কাছে এটা বিস্ময়কর ছিলো যে, কোনো ধরনের ভারী যন্ত্র ছাড়াই আজ থেকে চার হাজার বছর আগে কিভাবে মিশরীয়রা এসব পিরামিড তৈরি করেছিলো?

মিশরীয়দের তৈরি বিশালাকারের এসব পিরামিড তৈরিতে যে পাথরের ব্লকগুলো ব্যবহার করা হতো তার একেকটির ওজন প্রায় ২৭০০ কিলগ্রাম থেকে সত্তুর হাজার কিলোগ্রাম পর্যন্ত। কারো পক্ষে এই ব্লকগুলো উত্তোলন করা অসম্ভব। কিন্তু এরকম ওজনের প্রায় ২৮ লাখ ব্লক দিয়ে মিশরীয়রা পিরামিড তৈরি করেছে। যেখানে একটি ব্লকও অত্যাধুনিক মেশিন ছাড়া উত্তোলন সম্ভব নয় সেখানে ৪ হাজার বছর আগে মিশরীয়রা কিভাবে বিশাল বিশাল এসব পিরামিড তৈরি করেছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেছেন।

এলিয়েনরা তৈরি করেছে পিরামিড!

যেহেতু চার হাজার বছর আগে অত্যাধুনিক মেশিন ছিলো না তাহলে মিশরীয়রা কিভাবে এই পিরামিডগুলো তৈরি করেছিলো? এর একটা উত্তর অবশ্য আছে। যে উত্তরটি একটি থিওরির উপরে দণ্ডায়মান। যেই থিওরিকে বলা হয় ‘অরিওন কোরিলেশন থিওরি’। এই থিওরি মতে মিশরের পিরামিডগুলোর নির্মাতা আসলে মিশরীয়রা নয়। এই থিওরি মতে পিরামিডগুলো তৈরি করেছে এলিয়েন! শোনে অবিশ্বাস বা হাস্যকর মনে হলেও এই থিওরিটি একেবারেই হাস্যরসের উপাদান নয়। একটু খোলাসা করে বলা যাক।

brown camel near pyramid under clear blue sky

রাতের বেলা মিশরের পিরামিডগুলো দেখলে একটা বিশেষ দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আর সেটি হলো আকাশের নির্দিষ্ট তিনটি তারার সাথে শ্রেণিবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় পিরামিডগুলোকে। এই তারাগুলো হচ্ছে আলনিতাক, আল নিলাম এবং মিনতাক। রাতের বেলা এই তিনটি তারার অবস্থান থাকে পিরামিডের ঠিক উপরে। এটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘অরিওন কোরিলেশন থিওরি’।

এই থিওরি মতে ধারণা করা হয় আকাশের ওই তিনটি তারায় বসবাস করে এলিয়েনরা। যারা আজ থেকে চার হাজার বছর আগে নেমে এসেছিলো পৃথিবীতে। এলিয়েনদের সাথে ছিলো এডভান্স টেকনোলজি। যা দিয়ে তারা বিশালাকারের সব ব্লক দিয়ে নিখুঁতভাবে এসব পিরামিড তৈরি করেছিলো নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই থিওরিকে অনেকেই অবিশ্বাস করেন।

থিওরিটি অবিশ্বাস্য হলেও রাতের ওই তিনটি তারার সাথে যে মিশরের পিরামিডের একটা সম্পর্ক আছে তা বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেছেন। কেননা এই তিনটি তারার অবস্থান তিনটি পিরামিডের ঠিক উপরেই থাকে সবসময়। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন এই তিনটি তারার সাথে সম্পর্ক রয়েছে পিরামিডের ভেতরে মমি করে রাখা তাদের রাজা-রানীর আত্মার সাথে।

pyramid

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আজও বিজ্ঞানীদের চিন্তার কারণ হয়ে আছে এই পিরামিডগুলো।

পিরামিডের অন্য ইতিহাস

প্রাচীনতম পিরামিডের সমষ্টিকে গ্রেট পিরামিড বা বৃহৎ পিরামিড নামে অভিহিত করা হয়। ফারাও কুফূর নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়েছিল, যিনিই সম্ভবত পিরামিডটির অনুমোদন করেছিলেন। তিনি চতুর্থ রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা ছিলেন। মধ্যবর্তী পিরামিডটি খাফরের জন্য নির্মিত হয়েছিল। ইনি ওই রাজবংশের আটজন রাজার মধ্যে চতুর্থতম রাজা ছিলেন।

man looking at Pyramid of Giza

মেনকৌরের পিরামিড নামেও পরিচিত, অন্তিম পিরামিডটি রাজবংশের পঞ্চম রাজার নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছিল। তবে তখনকার দিনে পিরামিডগুলি কিভাবে নির্মিত তা আজও অধরা রয়ে গেছে। গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করতে প্রায় ১০০,০০০ জন কর্মীদের দীর্ঘ ২০ বছর সময় লেগেছিল। তবে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি উপসংহারে উপনীত হন যে, এটি ২০,০০০ জন কর্মীদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তিনটি পিরামিডই প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সময়ে বহু আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিল।

টানেলস অব পিরামিড

মিশরীয় পিরামিডগুলোর আরেকটি রহস্য হচ্ছে এর ভেতরে নির্মিত টানেল বা সুরঙ্গ পথ। এসব পিরামিডের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য সুরঙ্গ পথ। আদৌ কেন এই সুরঙ্গপথগুলো তৈরি করা হয়েছিলো তার সঠিক উত্তর আজ পর্যন্ত কেউই দিতে পারে নি। প্রথমদিকে বিশ্বাস করা হতো পিরামিডের ভেতরের সুরঙ্গ পথগুলো মূলত পিরামিডে ভেন্টিলেশনের জন্য হয়তো তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু পরবর্তীতে উৎসুক প্রত্মতাত্বিকরা যখন একটি রোবটকে পিরামিডের ভেতরে পাঠালেন তখন এই তথ্যটিও ভুল প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ পিরামিডগুলোর ভেতরে যে সুরঙ্গ পথ তা কোনো ধরনের ভেন্টিলেশনের জন্য তৈরি করা হয়নি। কেননা এই স্যরঙ্গ পথগুলো কংক্রিট দিয়ে বিপরীত বন্ধ করা ছিলো। তাহলে কিসের জন্য তৈরি করা হয়েছে এসব সুরঙ্গ পথ?

man near pyramid

মিশরের পিরামিডগুলোর ভেতরে কতগুলো সুরঙ্গ পথ বা চেম্বার আছে কেউ সঠিক করে বলতে পারে নি। তবে এ নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন তারা কিছু বিশেষ চেম্বারকে আলাদা করেছেন। যেগুলো হলো- কিংস চেম্বার, কুইন্স চেম্বার, বেইজ চেম্বার, বিগ ভয়েড, স্মল ভয়েড এবং গ্র্যাণ্ড গেলারি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা পিরামিডের ভেতরে থাকা অনেকগুলো চেম্বারের মধ্যে এই চেম্বারগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

পিরামিডের ভেতরের কিংস চেম্বারে মিশরীয়রা মৃত রাজাকে রাখতো। তারা বিশ্বাস করতো কিংস চেম্বারে মৃত রাজাকে রাখলে তার আত্মা খুব সহজেই আকাশের ওই তিনটি তারার সাথে মিলিত হতে পারবেন। এর থেকেও আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে এই পিরামিডের ভেতরে অসংখ দরজা রয়েছে। যা থেকে অনুমান করা হয় যারা এই পিরামিডগুলো তৈরি করেছিলেন তারা হয়তো চাচ্ছিলেন না কেউ এই দরজার ভেতরে প্রবেশ করুক। যেহেতু এর ভেতরে কেউ প্রবেশ করতে পারেনি আর মিশরের সরকারও একটা সময় এর ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলে বিষয়গুলো অমিমাংসীতই রয়ে গেছে। ধারনা করা হয় এই পিরামিডের ভেতরে আরো অসংখ্য চেম্বার রয়েছে। যা এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

পিরামিড কেন তৈরি করা হয়েছিলো ?

যেহেতু পিরামিডের গায়ে বিস্তারিত কিছু লেখা নেই তাই সাধারণভাবে মনে করা হতো মিশরীয়রা তাদের রাজা-রানীর মৃতদেহকে রাখার জন্য এসব পিরামিড তৈরি করেছিলো। মিশরের ‘মমি’র কথা জানেনা এরকম মানুষ খুব কম আছে। বলা হয়ে থাকে মিশরের যখন তাদের রাজা-রানী মারা যেতেন তখন তাদের মৃতদেহকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মমিকরণ করে এটিকে পিরামিডের মধ্যে রাখা হতো। ‘কিংস চেম্বার’ এবং ‘কুইন্স চেম্বার’ এই দুটির কথা আগেই লিখেছি। পিরামিডের মধ্যে নির্মিত এই দুটি চেম্বারে মিশরীয়রা তাদের রাজা-রানীকে রাখতেন।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে কী পিরামিডের ভেতরে অনেক মমি বা মৃতদেহ রাখা রয়েছে? বিস্ময়কর ব্যাপার হলো মিশরীয়রা তাদের রাজা-রানীকে মমি করে পিরামিডের ভেতরে রাখলেও আজ পর্যন্ত পিরামিডের ভেতরে একটি মমিও পাওয়া যায়নি! পিরামিডের ভেতরে রাখা মমিগুলো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এই রহস্য আজও কেউ বের করতে পারে নি।

pyramid of Egypt

এদিকে পিরামিডের ভেতরে যেহেতু মমি পাওয়া যায়নি তাই বিজ্ঞানীরা এলিয়েনের বিষয়টিতেই জোর দিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন হতেই পারে এটি এলিয়েনরা তাদের প্রয়োজনে তৈরি করেছিলো। কিন্তু আসলেই কেন এই পিরামিডগুলো তৈরি করা হয়েছে আর কারাই বা এগুলো নির্মাণ করেছে তার যুক্তিযুক্ত উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।