মেধাবী সন্তান জন্মদানে কতোটা কাজে আসবে গো-মূত্র দিয়ে তৈরি ‘পঞ্চগব্য’?

হেলাল আহমেদ: মেধাবী ও স্বাস্থ্যবান শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এজন্য গর্ভবতীকালীন সময়ে মায়েরা নানা ধরনের সচেতনতা অবলম্বন করে থাকেন।

এবার ভারতে মেধাবী আর স্বাস্থ্যবান সন্তান উৎপাদনে নেওয়া হয়েছে এক ভিন্ন উদ্যোগ। গরুর গোবর এবং মূত্র দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ঔষধ। ভারতের আয়ুশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে সরকারি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগএই ওষুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

বিশেষ এই ঔষুধটির নামপঞ্চগব্য। মূলত ৫টি উপকরণে তৈরি বলে এর নাম রাখা হয়েছে পঞ্চগব্য। এই উপকরণগুলো হলো গরুর গোবর, মূত্র, দুধ, ঘি এবং দই। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও এই পঞ্চগব্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। কামধেনু আয়োগের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, গর্ভবতী মহিলারা নিয়মিত এই ওষুধ সেবন করলে স্মার্ট, বুদ্ধিমান এবং স্বাস্থ্যবান শিশু জন্ম দিতে সক্ষম হবে।

শাস্ত্র পঞ্চগব্যসম্বন্ধে কী বলে?

পঞ্চগব্য হলো দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোমূত্র ও গোবর-এই পাঁচটি দ্রব্যর মিশ্রণ। বলা হয়ে থাকে এই পঞ্চদ্রব্যের মিশ্রণ ভালোভাবে করতে পারলে অনেক রোগ নিরাময়ে কাজে আসে। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রেও এই পঞ্চগব্যর উল্লেখ রয়েছে শাস্ত্রে। হিন্দু সমাজের অনেকেই আবার এই পঞ্চগব্যপ্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। যদিও এখন তা অনেকাংশেই কমে এসেছে। আবার এখনো হিন্দুসমাজের কোথাও কোথাও প্রায়শ্চিত্ত বা শাস্তি হিসেবে পঞ্চগব্য পানের বিধান প্রচলিত আছে। এছাড়াও হিন্দু পরিবারে একটি শিশু জন্মের পর যে পূজা করা হয়, সেই পূজা অনুষ্ঠানে শিশুটির শুভকামনায়অনেকে এই গো-মূত্র ব্যবহার করেন

ভারতে এখনো সংগ্রহ করা হয় গো মূত্র। ভাবা হয় এতে গর্ভের সন্তান হবে মেধাবী

গর্ভের সন্তান এবং ‘পঞ্চগব্য’ প্রভা

শাস্ত্রমতে প্রাচীনকাল থেকেই গো মূত্র ব্যবহার হয়ে আসছে। গর্ভের সন্তানের এবং পঞ্চগব্যপ্রভাব সামবেদীয়/যজুর্বেদীয়/ঋগবেদীয় দশসংস্কারের প্রথমেই আসে গর্ভাধান। আর এই পঞ্চগব্যযজুর্বেদীয় দশসংস্কারেরই অন্তর্ভুক্ত। গর্ভবতী মায়েদেরকে একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এইপঞ্চগব্যখাওয়ার বিধান রয়েছে শাস্ত্রে। বলা হয়ে থাকে উদ্ভিদ জগতেপঞ্চগব্যবৃদ্ধির সহায়ক। তাই প্রসূতি মায়ের পেটের সন্তান মেধাবী ও স্বাস্থ্যবান হবার জন্য গো গোবর, মূত্র দিয়ে ঔষুধের ব্যাপারে আশাবাদী কামধেনু আয়োগের কর্মকর্তারা।

কামধেনু আয়োগের চেয়ারম্যান বল্লবভাই কাঠিরিয়া বলেন, আয়ুশ মন্ত্রণালয় ও নবগঠিত প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র, ও মাঝারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাইবে। তাদের মাধ্যমে এটি বাজারজাত করা হবে। একই সঙ্গে ওষুধটি উৎপাদনের পর কামধেনু আয়োগ গ্রামে গ্রামে বৈদ্য নিয়োগ দেবে। তারা প্রসূতি নারীদের এই ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেবেন।

বৈজ্ঞানিকভাবে আদৌ গো মূত্রে কোনো উপযোগিতা আছে?

দেশের একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে গরুর মূত্রের উপযোগিতা থাকলেও বিজ্ঞান গো মূত্রের উপযোগিতা সম্বন্ধে বলেছে ভিন্ন কথা। অনেকের ধারণা ক্যান্সার নিরাময়েও গো মূত্র ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ গো মূত্রের মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময় করা যায়। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে গো মূত্রে কোনো উপযোগিতা নেই বলেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের প্রতিষ্ঠিত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় গোমূত্রের কোনও উপযোগিতা নেই। অন্যতম প্রবীণ অঙ্কোসার্জন টাটা মেমোরিয়াল সেন্টারের ডিরেক্টর ডাঃ রাজেন্দ্র বাদোয়ে বলেছেন, গোমূত্র বা ওই ধরনের কোনও জিনিসের ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিন্দুমাত্র উপযোগিতার কোনও প্রমাণ কোনও গবেষণায় পাওয়া যায়নি। বিশ্বে কেবলমাত্র রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি এবং বর্তমানে ইমিউনোথেরাপি স্তন ক্যান্সারের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার স্বীকৃত পদ্ধতি। এই ধরনের দাবি মানুষকে ভুল পথে চালিত করবে।

বৈজ্ঞানিকদের মতে গো মূত্রে কোনো উপযোগিতা নেই

ওই সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর প্রবীণ ক্যান্সার সার্জন ডাঃ পঙ্কজ চতুর্বেদীও বলেছেন এই ধরনের দাবি ক্যান্সারের রোগীদের ভুল পথে চালিত করবে। একই সেন্টারের অ্যাকাডেমিক ডিরেক্টর ডাঃ শ্রীপদ বনভলি বলেছেন স্তন ও ব্লাড ক্যান্সার বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসায় নিরাময় করা যায়।

এছাড়াও গোমূত্র ও পঞ্চগব্যকে রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করার জন্য আয়ুষ মন্ত্রক যথেষ্ট গুরুত্ব দিলেও এই সংক্রান্ত গবেষণা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ভারত ছাড়া আর কোথায় গো মূত্রের চাহিদা রয়েছে?

গো মূত্রের এই বিভ্রান্তিকর উপযোগিতা কেবল ভারত সীমানার মাঝেই আর আটকে নেই। ভারত ছাড়া আরো বিভিন্ন দেশেও এখন গো মূত্রকে রোগ নিরাময়ের কাজে ব্যবহার করা হয়।বিবিসির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, লন্ডনের কিছু দোকানে গো-মূত্র বিক্রি হয়। ওয়াটফোর্ডে অবস্থিত হরে কৃষ্ণ মন্দির, ভক্তিভেদান্ত মানর – এসব ধর্মীয় স্থাপনাগুলোরও ডেইরি ফার্ম রয়েছে যেখান থেকে তারা এই ‘গো-মূত্র’ উৎপাদন করে যেন পূজা সংশ্লিষ্ট সকল কাজে এটি ব্যবহার করা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশেও রয়েছে গো মূত্রের চাহিদা। ছবি: বিবিসি

মন্দিরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌরি দাস বিবিসিকে বলেন, “আমরা সত্তরের দশক থেকে এই গো-মূত্র প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করে আসছি। দক্ষিণ এশিয়ানদের অনেকের কাছে এর বিরাট একটি চাহিদা রয়েছে। অনেকে এটিকে পূজার কাজে ব্যবহার করে। আবার অনেকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। এমনকি কোনও জিনিস শুদ্ধ করার কাজেও অনেকে এই গো-মূত্র ব্যবহার করে।

মেধাবী এবং স্বাস্থ্যবান সন্তান উৎপাদনের জন্য ‘পঞ্চগব্য’ ঔষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ভারত দেশের পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে রেখে বেছে নিয়েছে পৌরাণিক ধারণা। শাস্ত্রমতে প্রাচীনকাল থেকে ‘পঞ্চগব্য’ ব্যবহৃত হয়ে আসলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো উপযোগিতা না থাকা সত্বেও গর্ভবতীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে এই ঔষধ। এই ঔষধ ব্যবহারের মাধ্যমে আদৌ মেধাবী ও স্বাস্থ্যবান সন্তান উৎপাদন হবে কী না সেটাই এখন দেখার বিষয়।