মৌলভীবাজারে এবার হয়েছে কমলার ভালো ফলন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি. এবছর মৌলভীবাজার জেলায় কমলার ফলন ভালো হয়েছে। ভালো আবহাওয়া ও পরিচর্যার কারণে গত বছরের চেয়ে উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে তবে পোকার আক্রমণে পাকার আগেই গাছ থেকে ঝড়ে পড়ছে কমলা। ফলের আকার বড় হওয়ায় ভালো দাম মিললেও আশানুরূপ লাভ নিয়ে শঙ্কিত চাষীরা।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসূত্র জানায়, এবছর জেলার জুড়ি, কুলাউড়া, বড়লেখাসহ বিভিন্ন উপজেলায় ৪৪০ একর জমিতে কমলার চাষ হয়েছে। এরমধ্যে জুড়ি উপজেলায় ২৩০ একর, বড়লেখায় ১৫০ এবং কুলাউড়ায় ১২০ একর আর অন্যান্য উপজেলায় বাকি ১০ একর জমিতে কমলার চাষ হয়েছে। গত বছর চাষ হয়েছিলো মোট ২৫০ একর জমিতে। সেই তুলনায় এবার চাষের পরিমাণ বেড়েছে ১৯০ একর। ছোট বড় ১৪৬টি কমলা বাগানে এবার হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয়েছে সাড়ে পাঁচ টন। যা গেলো বছর ছিলো সাড়ে চার টন। সেই হিসেবে এবার প্রতি হেক্টরে এক টন করে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। একক বাগান এবং যৌথ বাগানে পাঁচ শতাধীক কমলাচাষী রয়েছেন।

সম্প্রতি জুড়ি উপজেলার গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের রূপাছড়া ও লালছড়ার পাহাড়ি এলাকায় কমলা বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে সবুজ সোনালি ফল ঝুলে আছে। গাছভর্তি ফলন না হলেও কোন গাছই খালি নাই কমবেশি সকল গাছেই রয়েছে ফল। বাগানে বাগানে চলছে কমলা পাড়া, বাছাই ও কমলা ভর্তি ঝুড়ি তৈরি নিয়ে ব্যাস্ত চাষী ও শ্রমিকরা। সেখান থেকে পাইকাররা কমলা কিনে ছোট ট্রাকে করে সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। এলাকার প্রায় প্রতিটি টিলাতেই ছোট বড় কমলার বাগান রয়েছে। বাড়ির মধ্যে ঘরের পাশেও আছে কমলার গাছ।

লালছড়া গ্রামের কমলাচাষী মুর্শেদ মিয়া জানান তাঁর বাগানে প্রায় ১২ শ কমলা গাছ রয়েছে। অন্য বছরের তুলনায় এবার পরিচর্যা বেশি করায় ফলন বেশি হয়েছে কিন্তু ফল পাকা শুরু হতেই এক ধরনের পোকা কমলায় বসে রস খেয়ে নেয় এবং যেখানে বসে ওই জায়গায় পঁচন ধরে। তাই তারা আধা পাকা কমলা বিক্রি করে দিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে পাইকারের কাছে ১০০ কমলা ২০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন।

কমলাচাষী জয়নুল ইসলাম জানান, গাছ ভরে ফল এসেছে কিন্তু প্রতিদিন গাছ থেকে কমলা ঝরে পড়ছে। গান্ধি পোকা কমলার উপর দিয়ে হেঁটে গেলে সেই কমলা ঝরে পড়ে। পোকা কমলার মধ্যে সূঁইয়ের মতো শূড় ঢুকিয়ে দেয়। কৃষি বিভাগের পরামর্শে তারা বিভিন্ন ফাঁদ ব্যবহার করছেন কিন্তুকাজে আসছেনা। চাষীরা জানান, একটা গাছে ৫০ থেকে ১ হাজার পর্যন্ত কমলা ধরে। কিন্তু ৪০ শতাংশ কমলা ঝরে পড়ছে। এ কারণে চাষীরা আগাম বিক্রি করে ফেলছেন। ফল বড় হওয়ার আর সময় পায় না। মিষ্টি হতে পারে না। আবার ফল ধরার শুরুতেই অভাবের তাড়নায় অনেক চাষী অগ্রিম বিক্রি করে দেন। এরজন্য উপযুক্ত দাম পান না।  তাছাড়া কমলার ফলন মৌসুমের শুরুতে যখন গাছে ফুল আসে তখন সেচের অভাবে পানি দিতে পারেননি অনেকে। এজন্য সরকারিভাবে সেচ মেশিন, সার ও পোকাদমনে সরকারি সহায়তার দাবি তাদের। চাষীরা আরো জাানান, আগে কমলা চাষের একটি প্রকল্প ছিল। ২০০৮ থেকে সেই প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পের সময় প্রশিক্ষণ ও তাৎক্ষণিক পরামর্শে কমলাচাষীরা উপকৃত হয়েছেন। পূণরায় সেই প্রকল্প চালুর দাবি জানান তিনি।

জুড়ি উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রনি সিংহ জানান, জুড়ির গোয়াল বাড়িতে প্রায় ৬৫টি কমলা বাগান আছে। এখানে নাগপুরী, দার্জিলিং ও খাসি এই তিনজাতের মধ্যে খাসি জাতেরই বেশি চাষ হয়ে থাকে। ফল পাকার সময়েই গান্ধিপোকা আক্রমন করে। এখানে তারা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে দল গঠনের মাধ্যমে কাজ করছেন। পোকা দমনে ফেরেমেন ফাঁদ কীটনাষক ছিটানো নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার কার্যালয় জানায়, কমলার উৎপাদন নিশ্চিত করতে বর্ষার পরপর কমলা গাছের ডাল ছাঁটাই এবং খরার সময় সেচ দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে পৌষ থেকে ফাল্গুন মাসে সেচ দিলে রোগ ও পোকার আক্রমন কম হবে। অন্যদিকে কমলা গাছে কার্টাপ গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করলে গান্ধী, লিপমাইনরসহ অন্যান্য পোকা দমন সম্ভব। লেবু জাতীয় ফলে আগা মরা (ডাই বেক) ও গামোসিস (গাছ থেকে আঠার মতো কষ ঝরা) ধরনের রোগ দমনে কপারঅক্সিক্লোরাইড ও হেক্সাকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক ১৫ দিন পর পর তিন বার ¯েপ্র করলে এই জাতীয় রোগ দমন করা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক লুৎফুল বারি জানান, নিয়মিত সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগের অভাবে কমলা ঝরে পড়ছে। গাছে যে পরিমাণ কমলা আসে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় গাছ তা ধরে রাখতে পারে না। নিয়মিত কীটনাশক ¯েপ্র করলে গান্ধিপোকা দমন সম্ভব। তবে কয়েক বছর ধরে কমলার রোগ ও পোকামাকর দমনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। সুষম উৎপাদন পদ্ধতি তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, যারা তা পালন করেছেন তাদের ফলন ভালো হয়েছে।