মৌলভীবাজার আমন ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের দমনে আলোক ফাঁদ

সালেহ এলাহী কুটি, মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারে  রোপা আমন ধানে পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও দমনে কৃষকদের মাঝে আশার আলো  দেখিয়েছে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি।

ধানক্ষেতে পোকা আছে। সেই পোকার কোনোটা উপকারী, কোনোটা ক্ষতিকারক। পোকার আক্রমণ বেশি হলে কৃষক সব পোকা দমনেই কীটনাশক ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগে যেমন খাদ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ে। তেমনি কৃষকের আর্থিক ব্যয়ও বাড়ে। পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় জেলার সাতটি উপজেলার ২০৫ টি ব্লকে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমন ধানক্ষেতের কোথায় কি ধরনের পোকার উপস্থিতি আছে। কোন খেতে পোকার পরিমাণ কেমন। কোন এলাকায় কোন ধরনের ক্ষতিকর পোকা বেশি। তার ওপর একযোগে জরিপ চালাতে মৌলভীবাজার জেলায় প্রয়োগ করা হয়েছে আলোক ফাঁদ পদ্ধতি। এই ফাঁদে ধরা পড়া পোকা যাচাই-বাছাই করে ক্ষতিকর পোকার ধারণা এবং প্রতিকারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোপা আমন তোলা পর্যন্ত এই প্রযুক্তি চলবে।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সারা জেলার বিভিন্ন স্থানে আমন খেতের পাশে স্থাপন করা হয়েছে আলোক ফাঁদ। চার্জার বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে খেতের পাশে। সেই চার্জারের নিচে একটি পাত্রে রাখা হয়েছে সাবান বা ডিটারজেন্ট গোলা পানি। আলোর মোহে ছুটে আসা পোকা সেই পানিতে পড়ে আটকে গেছে। ছোটবড় অনেক ধরনের ও অনেক আকারের পোকা ছিল এরমধ্যে। জেলার সাতটি উপজেলার ৬৭টি ইউনিয়নের ২০৫টি ব্লকে এবং ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এনএটিপি)-২ প্রকল্পের ৫৫০টি কৃষক গ্রুপে এবং পুষ্টি প্রকল্পের ৪১টি কৃষক গ্রুপে একযোগে আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়।

কৃষি জমির পাশে চার্জ অথবা বৈদ্যুতিক লাইট দুই থেকে তিন ফুট  উঁচুতে তিনটি খুঁটির সাথে লাগিয়ে সেই লাইটের নিচে সাবান বা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি গামলায় রেখে পোকা দমনের ফাঁদ সৃষ্টি করা হয়। জ্বলে ওঠা লাইট ঘিরে আলোক স্পর্শী পোকামাকড় ছুটে এসে আলোর নিচে পেতে রাখা গামলা ভর্তি সাবানের ফেনায় আটকে যাচ্ছিল। আলোক ফাঁদে আটকে পড়া আমন ফসলের এসব ক্ষতিকারক পোকা কৃষকরা চিহ্নিত করেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের সিরাজনগর মাঠে স্থাপিত আলোক ফাঁদ ঘিরে সমবেত হয়েছিলেন স্থানীয় শতাধিক কৃষক।

কৃষকরা জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় এই প্রযুক্তিতে ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপস্থিতি জানতে পারছেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিরাজনগর  গ্রামের ওয়াহিদুজ্জান বলেন, ফসলের মাঠে এখন ধানের কুশী বের হওয়ার সময়। এসময় ধানের খোলসে দুধ আসে। ক্ষতিকর পোকারা তা শুষে নেয়। এতে ফসল অপুষ্টিতে ভুগে আমাদের ফসল মার খায়। তাই পোকা দমন অত্যন্ত জরুরী। আলোক ফাঁদের মাধ্যমে মূল ধানক্ষেতে পোকার উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। এছাড়া ক্ষতিকর অনেক পোকাও দমন হয়। এটি পরিবেশ-বান্ধব একটি পোকা দমন প্রক্রিয়া। আমরা কীটনাশক ছাড়া এখন আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে ফসল সুরক্ষা করতে পারবো। ফলে ফসল উৎপাদনে খরচ কম হবে বলে জানান তিনি।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের শওকত মিয়া বলেন,ধানগাছে পোকামাকড়ের আক্রমণ স্বাভাবিক হলেও ফলনের জন্য তা খুবই ক্ষতিকর। ধানগাছে বাদামি ঘাসফড়িঙ, সবুজ ঘাসফড়িঙ, পাতা মোড়ানো পোকা, গান্ধী পোকা, মাজরা পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করে। এর মধ্যে বাদামি ঘাসফড়িঙ বা কারেন্ট পোকা সবচেয়ে ক্ষতিকর। এ পোকা যে গাছে আক্রমণ করে, সেই গাছের শিষ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ফলন কমে যায়। এতে আমরা ভালো ফলন হলেও ধানের পরিমাণ কমে যায়। এখন আর এটা হবে না কারণ আলো দিয়ে আমরা পোকা দমন করতে পারবো।

একই গ্রামের তয়াহিদ মিয়া বলেন, আমি  ১০ একর জমিতে আমন চাষ করেছি। আমি কীটনাশক ব্যবহার করলেও পাশে জমির মালিক কীটনাশক ব্যবহার না করায় আমার খেতে কীটনাশক দিয়ে কোন উপকার পাই নাই। এখন এই ব্যবস্থায় সবার খেতের পোকা দমন কবে। আর পরিবেশের ও ক্ষতি হবে না। শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নিলুফা ইয়াসমিন সোনালিসা সুইটি, জানিয়েছে, ফসলের ক্ষেতে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে এবং ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে আলোক ফাঁদ একটি জৈবিক বালাই দমনের যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি। এতে খুব কম খরচে সফলভাবে পোকা দমন করা যায়। বিভিন্ন সময় কৃষকরা এরকম আলোক ফাঁদের মাধ্যমে পোকা দমন করে থাকেন। এই পদ্ধতির ব্যাপকতা বাড়াতে একসাথে সারা জেলায় আলোক ফাঁদ উৎসব করা হয়েছে। যাতে নিয়মিত তারা এই পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

মৌলভীবাজার  সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুব্রত কান্তি দত্ত বলেন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের মহলদার বাড়ি সংলগ্ন মাঠে এবং গিয়াসনগর ইউনিয়নের ভোমরা গ্রামের মাঠে আলোক ফাঁদে আটকে পড়া উপকারী এবং অপকারী পোকা শনাক্ত করা হয়। ফাঁদে আটকা পড়া পোকার মধ্যে ফসলের অনিষ্ঠকারী মাজরা, পাতা মোড়ানো, চুঙ্গি ও সবুজ পাতা ফড়িং পোকা পাওয়া গেছে। তেমনি পাওয়া গেছে উপকারী পোকা হিসেবে বিভিন্ন ধরনের বোলতার উপস্থিতি। কৃষি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকারক পোকার লক্ষণ, প্রতিকার এবং প্রতিরোধ বিষয়ক তথ্য কৃষকদের মধ্যে উপস্থাপন করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, ফসল অপুষ্টিতে ভুগে কৃষকের ফসল মার খায়। তাই পোকা দমন অত্যন্ত জরুরী। পরিবেশ-বান্ধব আলোক ফাঁদের মাধ্যমে ধান ক্ষেতে পোকার উপস্থিতি নির্ণয় এবং দমন করা সম্ভব । পোকা দমনে সব সময়ই আলোর ফাঁদ স্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু একযোগে সারা জেলায় এর আগে হয়নি। একযোগে হওয়ায় সারা জেলার বিভিন্ন খেতে পোকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। কোন এলাকায়, কোন মাঠে কি ধরনের ক্ষতিকর পোকা আছে। এই জরিপ থেকে সেটা জানা যাবে। পোকার অবস্থান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকরা কোথায় কি ধরনের ব্যবস্থা নিবেন। আলোক ফাঁদের জরিপ থেকে এ বিষয়ে বলা সহজ হবে।

মৌলভীবাজার জেলায় এ বছর ৯৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত রোপা আমনে বড় রকমের কোনো দুর্যোগ দেখা যায়নি। আমনে বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা।

আইনিউজ/এসডি