যেখানে আমার গোধূলি লগ্ন

নূরুর রহমান তরফদার

আমি তখন বালক, সবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। প্রধান গেট দিয়ে ঢুকতেই ধাক্কা। ফটকের ভেতর ঢুকেই হাতের ডান দিকে দুটো গাছ, একটাতে সাদা সাদা বড় বড় ফুল ফোটে আছে, এর কলিগুলো কলার থোড়ের মতো দেখতে। পাশের গাছটিতে কোনো ফুল নেই, নিচে গাঢ় সবুজ পাতা আর উপরের দিকে নানা রঙের পাতা।

হঠাৎ একটা আইডিয়া মাথায় চাপলো, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতজনকে কিছু প্লান্ট এনে দেই। কিছু বিরল ফুলের প্লান্ট। এই ধারাবাহিকতায় এবার নিয়ে আসলাম দুটো ম্যাগনোলিয়া প্লান্ট। কোথাও না কোথাও লাগিয়ে দেবো। জীবনের শুরুতে আমার পথে ম্যাগনোলিয়া তার ভুবন মোহিনী রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, যেখানে আমার গোধূলি লগ্ন।

এমন গাছ আমি তখনও দেখিনি আর কোথাও। ফুলগুলো বেশিদিন থাকেনি, বড় ক্লাসের ছেলেরা ছিঁড়ে নিয়ে যেতেন একটা একটা করে। এ ফুলের নাম কি? আর কোথাও নেই কেন? এ সব প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে মনে বারবার। কতজনকে কতবার জিজ্ঞেস করেছি কোনো সদুত্তর পাইনি। একটু বড় হয়ে যখন শ্রী স্বপন কুমার সিরিজ ধরেছি তখন পাবলিক লাইব্রেরী’র মেম্বারশিপ নিলাম। সেই সুবাদে ঘন ঘন পাবলিক লাইব্রেরীতে যেতাম। পাবলিক লাইব্রেরী’র সামনেই একটা গোল পুকুর, শান বাঁধানো ঘাট। একদিন চোখে পড়লো ঘাটের ডান দিকে একটা কালো পাতার গাছে সেই ফুল। এ দুটো গাছ দেখার পরে বহু বছর পেরিয়ে গেছে আমি আর এই ফুল এই গাছে আর কোথাও দেখিনি। যখনই নুতন কোথাও গিয়েছি আমি, চোখ আমার অজান্তেই এই ফুল-এই গাছ খোঁজে বেড়াতো। আমি যখন বড় ক্লাসে তখন হঠাৎ দেখলাম গাছগুলো আর নেই।

ফুল সখা নূরুর রহমান তরফদার

বাবা বাগান করতেন যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিলাম, ফুল আর গানের কদর ছিল বাসায়। বাবা সারাদিন বাগানের পেছনে লেগেই থাকতেন। আমাদের বাগানের ঝুমকো লতা আর কামিনী ফুলের গন্ধ আমার হৃদয় মন কেড়ে নিতো।

এখানে এই মৌলভীবাজারে ফুলের, সঙীতের তেমন কদর নেই। শহরের হাসপাতাল সড়কের হাসপাতালের আউটডোরের সামনে একটা ছোট গোলাপ বাগান ছিল। সব মিলিয়ে গোটা দশেক গোলাপ গাছ ছিল এ বাগানের, প্রচুর গোলাপ হতো। বাইরে থেকে আসা কোনো সৌখিন ডাক্তার গড়ে তুলেছিলেন এ বাগানটা। বছর কয়েক পরে এ বাগানটাও আর থাকেনি ।

তখন বড় ক্লাসে পড়ি একটা বাগান করার ভূত মাথায় চেপে বসে। প্রথমে রঙ্গন দিয়ে শুরু করি। ঢাকা থেকে নিয়ে আসি নানা রঙের রঙ্গন। মেলা থেকে কিনে আনি ফুলের ওপর অনেক বই।

তখনই ম্যাগনোলিয়াকে জানার সুযোগ হয় আমার। শ্বেতশুভ্র মনোরম ফুল ম্যাগনোলিয়া সৌন্দর্য ও সুগন্ধের জন্য সারাবিশ্বেই ব্যাপক সমাদৃত। কবিগুরু এই ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নাম দিয়েছিলেন উদয়পদ্ম। ডালের ঠিক আগায় সূর্যের মতো উদয় হয় বলেই হয়তো উদয়পদ্ম নামকরণ। অবশ্য উদয়পদ্ম দেখতে অনেকটা পদ্মের মতো হলেও পদ্ম নয়। হিমচাঁপা নামেও এটি বাংলা ও হিন্দিতে পরিচিত। ইংরেজি নাম Southern magnolia, Bull bay, Laural magnolia, Magnolia, Southern magnolia এবং বৈজ্ঞানিক নাম : Magnolia grandiflora। ফুল খুব চটকদার। ডালের আগায় ফোটা একেকটি ফুল ঠিক যেন একেকটি পদ্ম ফুল। মখমলের মতো মোলায়েম ও নরম ছয় থেকে বারোটি পাপড়িতে বিন্যস্ত সাদা বা হালকা ঘিয়ে রঙা পিরিচাকৃতির বৃহৎ সাদা ফুলে কিছুটা লেবুর সুগন্ধ। সাত-সকালে ঘন সন্নিবেশিত পাপড়িতে সদ্য ফোটা ম্যাগনোলিয়া দেখতে অপূর্ব, মনোরম, আকর্ষণীয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাপড়িগুলো ছড়িয়ে পড়ে এবং মলিন হয়ে যায়। একদিনের ব্যবধানেই বাসি হয়ে ঝরে পড়ে।

ম্যাগনোলিয়ার ফল ডিম্বাকার। কিছুটা গোলাপি রঙের, ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা। ফল বীজে পরিপূর্ণ। বীজ পাখিদের প্রিয়। পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বংশবৃদ্ধি সহজসাধ্য নয় এবং সাধারণত কলম ও দাবা কলমের মাধ্যমে করা হয়। লবণাক্ত মাটি, বায়ুপূর্ণ সমুদ্রতীরবর্তী এলাকাতেও এটি ভালো হয়। ম্যাগনোলিয়া গাছের কাঠ ভারী ও শক্ত। আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ কালে কনফেডারেট আর্মি ম্যাগনোলিয়া কে তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। তাছাড়া ম্যাগনোলিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের জাতীয় ফুল ও মিসিসিপির জাতীয় বৃক্ষ।

বাগান নিয়ে মেতে ছিলাম অনেক দিন। কামিনী, হাস্নাহেনা, শিউলি, গন্ধরাজ, টগর, আলামান্ডা, জুঁই, বেলি, নানা রঙের গোলাপ, বোগেন ভিলিয়া, আরো কত ফুল। তখন আমাদের শহর থেকে তখনও হিন্দু বাঙালীরা চলে যান নি। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হতাম। এমন কোনো বাড়ি ছিল না যেখানে কিছু না কিছু ফুল চর্চা হতো না।

মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়ন আমাকে ঠেলে দেয় দেশের বাইরে। সেটা সত্তরের দশকের শেষ ভাগ। জার্মানিতে গিয়ে প্রথম আমি রঙিন ম্যাগনোলিয়া দেখতে পাই। জার্মানদের ফুল দেখতে মাঝে মাঝেই গিয়ে বসে থাকতাম ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের ঠিক মাঝখানে পালমেনগার্টেনে। তার পর সেখান থেকে বাহামাতে। সেখানেও ম্যাগনোলিয়ার কোনো অভাব নেই। এর পর ম্যাগনোলিয়ার আদি নিবাস ফ্লোরিডাতে। তারপর ক্যালিফোর্নিয়াতে। এই এলাকায় ম্যাগনোলিয়া গাছ বিশাল আকৃতির আর কত যে ফুল। কানাডার আলবার্টা যেখানে আমার ছোট ঘর সেখানকার প্রকৃতিতে ম্যাগনোলিয়া যায় না। এখানে আছে দৃষ্টিনন্দন পিওনি, নানা রঙের লাইলাক, হানি সাকল, ক্যামেলিয়া আর ওয়াইল্ড রোজ।

আজকাল দেশে আসি নাড়ীর টানে, ঘন ঘনই আসি। কিন্তু ফুল লাগাবো কোথায়? নিজের তো কোনো ঘর-বাড়ি নেই।

হঠাৎ একটা আইডিয়া মাথায় চাপলো, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতজনকে কিছু প্লান্ট এনে দেই। কিছু বিরল ফুলের প্লান্ট। এই ধারাবাহিকতায় এবার নিয়ে আসলাম দুটো ম্যাগনোলিয়া প্লান্ট। কোথাও না কোথাও লাগিয়ে দেবো। জীবনের শুরুতে আমার পথে ম্যাগনোলিয়া তার ভুবন মোহিনী রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, যেখানে আমার গোধূলি লগ্ন।

নূরুর রহমান তরফদার, ফুল-সখা