শ্রীমঙ্গলে অপরাজিতারূপে পূজিত ‘কুমারী মা’ (ভিডিও)

এস কে দাশ সুমন, শ্রীমঙ্গল : শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমী তিথিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রঘুনাথপুর কালীবাড়িতে অনুষ্ঠিত হলো কুমারী পূজা। রোববার (৬ আগস্ট) দেবী দুর্গার অপরাজিতারূপে পূজিত হন ১০ বছরের ‘কুমারী মা’ রিশিতা চক্রবর্তী।

সকাল সাড়ে ৯টায় মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হন ‘কুমারী মা’। এ সময় বিরামহীন ঢাক-ঢোল, কাঁসর আর ঘণ্টার শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। এতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন ধর্মালম্বী হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় জমে।

জয়ধ্বনি দিয়ে ভক্তরা বরণ করে নেন ‘কুমারী মা’কে। মাতৃভাবে কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা করে তাতে জগৎ জননীর উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করার উদ্দেশেই এ কুমারীপূজা।

এবারের ‘কুমারী মা’ রিশিতা শ্রীমঙ্গল সিন্দুর খান এলাকার রিপন চক্রবর্তীর মেয়ে। সে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী।

‘কুমারী মা’ আসনে আসার পরপরই শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শুরুতেই গঙ্গা জল ছিটিয়ে ‘কুমারী মা’-কে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করে তোলা হয়। এরপর চরণযুগল ধুয়ে তাকে বিশেষ অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। অর্ঘ্যের শঙ্খপাত্র সজ্জিত ছিল গঙ্গাজল, বেল পাতা, আতপ চাল, চন্দন, পুষ্প ও দূর্বাঘাস দিয়ে।

কুমারীপূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বায়ু- এ পাঁচ উপকরণে দেওয়া হয় ‘কুমারী’ মায়ের পূজা। অর্ঘ্য প্রদানের পর দেবীর গলায় পরানো হয় পুষ্পমাল্য। পূজা শেষে প্রধান পুজারী দেবীর আরতি দেন এবং প্রণাম করেন। সবশেষে পূজার মন্ত্রপাঠ করে ভক্তদের মধ্যে চরণামৃত বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

পূজা উপলক্ষে ভক্তদের জন্য শ্রীমঙ্গল রঘুনাথপুর কালী বাড়ি ছাড়াও দেশের অন্যান্য পূজামণ্ডপ ও সংলগ্ন এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা৷

বাংলাদেশ  পূজা  উদযাপন  পরিষদ  শ্রীমঙ্গল উপজেলা  শাখার  সাধারণ  সম্পাদক  সুশীল  শীল আই নিউজকে  বলেন, এই  কালী  মন্দিরে  বহু  বছর  ধরে  কুমারী  পূজা  হয়ে  আসছে  জেলার  বিভিন্ন  জায়গা  থেকে  প্রচুর  দর্শনার্থী  ভিড়  করেন  এখানে ।

শ্রীমঙ্গল  থানার  ভারপ্রাপ্ত  কর্মকর্তা  (ওসি)  আব্দুস  ছালেক আই নিউজকে  বলেন, যেহেতু  এই  মন্দিরে  কুমারী  পূজা দেখতে  প্রচুর  মানুষ  আসে।  তাই  আমরা  কুমারী পূজা  উপলক্ষে  পূজার  মন্ডপ  ও  আশেপাশে  ব্যাপক  পুলিশী  নিরাপত্তা  ব্যবস্থা  করেছি।

কুমারী পূজা

কুমারী  পূজা  হলো  তন্ত্রশাস্ত্রমতে  অনধিক  ষোলো  বছরের  অরজঃস্বলা  কুমারী  মেয়ের  পূজা।  বিশেষত  দুর্গাপূজার  অঙ্গরূপে  এই  পূজা  অনুষ্ঠিত  হয়। এছাড়াও  কালীপূজা,  জগদ্ধাত্রীপূজা  এবং  অন্নপূর্ণা  পূজা  উপলক্ষে  এবং  কামাখ্যাদি  শক্তিক্ষেত্রেও  কুমারী  পূজার  প্রচলন  রয়েছে  সনাতনী  সমাজে।

বাংলাদেশে  সূদূর  অতীত  থেকেই  কুমারী  পূজার  প্রচলন  ছিলো  অষ্টমী  তিথিতে, পৌরাণিক  উপাখ্যান   সম্পাদনা  ও  শাস্ত্রমতে  কুমারী  পূজার  উদ্ভব  হয়  কোলাসুর  নামক অসুরকে   বধ  করার  মধ্য  দিয়ে  থেকে। গল্পে  বর্ণিত  রয়েছে,  কোলাসুর  এক  সময়  স্বর্গ – মর্ত্য  অধিকার  করায়  বিপন্ন  দেবগণ  মহাকালীর  শরণাপন্ন  হন।  তখন  সকল  দেবগণের  আবেদনে  সাড়া  দিযে়  দেবী  পুনর্জন্মে  কুমারীরূপে  কোলাসুরকে  বধ  করেন। এরপর  থেকেই  মর্ত্যে  কুমারী  পূজার  প্রচলন  শুরু  হয়।

কুমারী  প্রকৃতি  বা  নারী  জাতির  প্রতীক  ও  বীজাবস্থা।  তাই  কুমারী  বা  নারীতে  দেবীভাব  আরোপ  করে  তার  সাধনা  করা  হয়।

কুমারি পূজা  ও সম্প্রীতি

স্বামী দেবধ্যানানন্দ : সন্ন্যাসী, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা

সনাতন শাস্ত্র বলছে- ‘কেউই নিজ সন্তানকে অথবা আর কাউকে তাদের জন্য ভালোবাসে না, আত্মা বা সত্তার জন্যই ভালোবেসে থাকে।’ ‘জগতে যা কিছু রয়েছে, তা সব প্রেমস্বরূপ ভগবানের সত্তায় সত্তাবান; তারই বিভিন্ন রূপ প্রকাশ’, ‘তিনি জগৎ রূপে প্রকাশিত আবার তিনিই জগতের অতীত।’

ধর্মের আচার্যগণ বলে থাকেন- ‘ভগবান যেন এক বৃহৎ চুম্বক-প্রস্তর, আমরা যেন লৌহচূর্ণের ন্যায়। আমরা সবাই সদাসর্বদা তার দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছি। তিনিই আমাদের ভালোবাসার আদর্শ। তিনি বাক্য ও মনের অগোচর হলেও শুদ্ধ মন ও শুদ্ধ বুদ্ধির গোচর।’

উপাসনার সুবিধার্থে এবং রুচি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যবশত ভক্ত উল্লিখিত বিভিন্ন ভালোবাসার সম্বন্ধ (মাতা, পিতা ইত্যাদি) ভগবানের প্রতি আরোপ করে থাকেন। ‘মা’ নাম অত্যন্ত মধুর ও পবিত্র। সন্তান মাকে সর্বশক্তিময়ী মনে করে, ভাবে- মা সব করতে পারে। মায়ের কাছে থাকলেই তার নির্ভয়তা ও আনন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন- মাতৃভাব শুদ্ধভাব। দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মানুষ্ঠান; মাতৃভাবে ঈশ্বরের উপাসনা ও তাকে ভালোবাসার প্রয়াস। কুমারী পূজা এর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গানুষ্ঠান।

সাধারণত দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমারী পূজা করা হয়। তবে শাস্ত্রমতে সপ্তমী, নবমীতেও করা যেতে পারে। এক থেকে ষোলো বছরের অজাতপুষ্প বালিকাদের কুমারী পূজার জন্য নির্বাচন করা হয়। বয়সভেদে কুমারীর বিভিন্ন নাম যেমন- সন্ধ্যা (১ বছর), সরস্বতী (২ বছর)… সুভগা (৫ বছর)… অম্বা (১৬ বছর)। কুমারীকে বস্ত্রালংকারে সুসজ্জিত করে বিধিমতো নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে পাদ্য, অর্ঘ্য, ধূপ, দীপ, গন্ধ, পুষ্প, নৈবেদ্য ইত্যাদি ষোড়শোপচারে বাহ্যপূজা করা হয়।

আবার হৃদয়ে ধ্যানের মাধ্যমে মানসপূজাও করা হয়। কুমারীর একটি ধ্যান মন্ত্রে আছে : যিনি ত্রিনয়নী, চন্দ্রশোভিত যার মস্তক এবং দেহকান্তি তপ্তকাঞ্চনতুল্য, যিনি নানাবিধ অলঙ্কার বিভূষিতা, রক্তবস্ত্র ও রক্তমাল্য পরিহিতা এবং রক্তচন্দনাদি দ্বারা চর্চিত যার দেহ, যার বাম ও দক্ষিণ হস্তদ্বয় যথাক্রমে বর ও অভয় প্রদানের জন্য প্রসারিত- সেই পদ্মাসীনা কুমারীকে ধ্যান করি।