সাশ্রয়ে আশ্রয়

জেসমিন চৌধুরী

টেসকো সুপারস্টোরের চেক-আউট বেল্টে সাজানো আমার একদিনের বাজার-সওদার ছবি দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, ‘ধারণা করুন কত পাউন্ডের খাবার হতে পারে এখানে।’ উন্নত মানের এক পাহাড় খাবার। খাবারের অনুমিত মূল্যের রেঞ্জ ছিল ৩০ থেকে ৬০ পাউন্ড। যারা মন্তব্য করেছেন তাদের বেশিরভাগই এদেশে থাকেন না তবু তাদের অনুমানের প্রশংসা করতে হয়। বেল্টের উপরে স্তুপিকৃত খাবারের প্রকৃত মূল্য ছিল ৬০ পাউন্ড কিন্তু এগুলো কিনতে গিয়ে আমি খরচ করেছিলাম মাত্র ১২ পাউন্ড। কীভাবে সম্ভব? সেই গল্পটা বলব বলেই এই দীর্ঘ ভূমিকা।

এদেশের অন্যান্য সুপার মার্কেটের খবর আমার ঠিক জানা নেই, আমি টেসকোর নিয়মিত খদ্দের হিসেবে তাদের খবরই রাখি। আমার বাসা থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ এই বিশাল টেসকো স্টোরটা আমার বর্ধিত রান্নাঘরের মতই, বড় আপন মনে হয়। বিশাল এই স্টোরের প্রতিটা কর্মচারিকে আমি চিনি, বাজার করতে গেলে এদের সাথে টুকটাক গল্পও হয়।

তো এই টেসকো স্টোরে প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে একটা মজার ঘটনা ঘটে। যেসব শাকসব্জি, ফলমূল, মাছমাংস বা অন্যান্য ফ্রেশ খাবারের আজই শেষ তারিখ সেগুলো সব পানির দামে ছেড়ে দেয়া হয়। যে মাছের দাম মূলত দশ পাউন্ড সেটা পাওয়া যায় দুই থেকে আড়াই পাউন্ডে। টেসকোর খাদ্যসামগ্রীগুলোর মান এতোই উন্নত যে যেসব ফলমূলের আজ শেষ তারিখ, দেখা যায় দশ বারোদিন পরও সেগুলো যথেষ্ট ফ্রেশ রয়েছে।

মাঝে মধ্যে আমি দুপুর দিকে বাজার করতে যাই, তখন থেকেই শুরু হয় ডিসকাউন্টের প্রক্রিয়া। প্রথমে ১০% ছাড়, কয়েক ঘন্টা পর ২০%, এরকম করতে করতে সন্ধ্যায় একেবারে ৮০% এ গিয়ে পৌঁছায়। ফলমূল বিভাগের দায়িত্বে রয়েছে যে বৃদ্ধ লোকটি সে আমাকে দেখে মুচকি হেসে বলে, ‘এখনো ভাল ছাড় দেয়া হয়নি, বিকালে আসো’। বিকালে গেলে অনেক সময় আগে ভাগেই ডিসকাউন্ট টিকিট মেরে আমার ট্রলিতে সে এটা সেটা তুলে দেয়।

৮০% ছাড় দেবার সময় হবার একটু আগেই রিডিউসড শেলফের আশেপাশে সস্তায় বাজার করতে চাওয়া মানুষের ভীড় লেগে যায়। লোকজন যার যার ট্রলি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে যাতে সবার আগে ভালো জিনিসটা তুলে নিতে পারে। রিডিউসড ট্যাগ লাগানো জিনিসগুলো শেলফে তোলা শুরু হতেই কাড়াকাড়ি পড়ে যায়, কে কার আগে কোনটা নিজের ট্রলিতে তুলবে। মাছ-মাংসের প্রতিই সবার আগ্রহ বেশি।

এদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ মারমুখী। টাক মাথার এক বয়স্ক ইংরেজ লোককে প্রায়ই দেখি, কাড়াকাড়িতে সে মহা উস্তাদ। বড় বড় মাংসের প্যাকেটগুলো সবার আগে ঝাঁপটাঝাঁপটি করে সে নিজের ট্রলিতে টেনে তুলে ফেলে। কেউ ভালো একটা কিছুতে হাত দিয়েছে তো কী, সে হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘দ্যাট ইজ মাইন, আই সো ইট ফার্স্ট’।

একদিন দেখলাম তার ট্রলিতে সে প্রায় বিশ প্যাকেট পাউরুটি তুলে নিয়েছে। এক পাউন্ড মূল্যের পাউরুটি মাত্র দশ পেনিতে কিনতে পারলে লোভ সামলানো কঠিন, কিন্তু তাই বলে এতোগুলো? ধমক খাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই আমি জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ‘তুমি এতোগুলো পাউরুটি খাবে কী করে?’

লোকটার সাথে কথা বলে অবাক হয়ে গেলাম। শেলফ থেকে জিনিস তুলে নেয়ার সময় মারামারি, চেঁচামেচি করা এই লোকটা আদতে খুব নরম মনের মানুষ। সে একটা দরিদ্র এলাকায় থাকে, তার প্রতিবেশীরা অনেকেই বৃদ্ধ এবং ডিসেবলড। তাদের অনেকেরই গাড়ি নেই, নিজেরা শপিং করতে আসতে পারে না তাই লোকটা নিয়মিত তাদের জন্য বাজার করে নিয়ে যায়। কাড়াকাড়ি মারামারি সে নিজের জন্য করে না। পরদিন আমাকে দেখেই সে হেসে বলল, ‘তোমার কী কী লাগবে আমাকে বলে রাখো, আমি তুলে নিয়ে তোমার ট্রলিতে দেব’। সে লক্ষ করেছে আমি কাড়াকাড়ি করতে পারি না। অপেক্ষা করি, অন্যদের নেয়া শেষ হলে কিছু বাকি থাকলে নেই। টাকমাথার মারমুখো লোকটা সেদিন থেকে আমার বন্ধু হয়ে গেল।

মোবিলিটি কারে বসা একজন ডিসেবলড এশিয়ান মহিলাকে দেখি প্রায়ই। বোধ হয় কাছেই থাকেন তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় চলে আসেন বাজার করতে। ডিসেবল্ড হলে কী হবে, এই মহিলাও কম মারমুখী না। হাতের লাঠিটা দিয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো চিহ্নিত করে ফেলেন তিনি, কেউ সেগুলোতে হাত দিলেই চেঁচিয়ে ওঠেন। একদিন দেখি কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে তিনি তার মোবিলিটি কার থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে তার পছন্দের জিনিসগুলো তার বাস্কেটে তুলে দিলাম, নিজের ট্রলিতে সেদিন কিছুই তোলা হলো না।

নিরীহ চেহারার হালকা পাতলা চায়নিজ এক লোক হাতে একটা বাস্কেট নিয়ে এক পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। সে ও কাড়াকাড়ি ঝাঁপটাঝাঁপটি করতে পারে না। সম্ভবত ইংরেজিও বলতে পারে না। সেদিন সুবিধামত নিজের ট্রলিতে অনেকগুলো জিনিস তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছি, দেখি সে আমার ট্রলির খাবারগুলোর দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখান থেকে কিছু প্রয়োজন তোমার?’ নাশপাতির একটা বড় প্যাকেটের দিকে আংগুল নির্দেশ করল সে। প্যাকেটটা তার বাস্কেটে তুলে দিলাম।

সস্তার বাজার করতে আসা এই লোকগুলোর ভীড়ে হারিয়ে যেতে লজ্জা অনুভব করি না আমি, বরং এদের চেহারার দিকে তাকাই, কাপড় চোপড় নিরীক্ষণ করি, এদের জীবনের গল্পগুলো অনুমান করার চেষ্টা করি।

আমার নিজেরও তো গল্প আছে একটা। আমি চাইলেই অনেক টাকা রোজগার করতে পারি কিন্তু নিজের যা কিছু করতে ভালো লাগে- নাটক, লেখালেখি, বনবাদাড়ে হাঁটাহাঁটি- করতে গিয়ে আমি রোজগারে মন দিতে পারি না। বিলেতে বসেও আমার স্বল্প রোজগারে বাংলাদেশ থেকে অনেক সস্তায় অনেক ভালো খাওয়া-দাওয়া করতে টেসকোর এই ডিসকাউন্ট পলিসি খুবই সহায়ক।

অনেকে আমাদের দিকে আড়চোখে তাকায়, তারা কী ভাবে জানি না, কিন্তু আমার মত আরো যারা সস্তায় জিনিস কিনতে ভীড় জমায় তারা নিজের অজান্তেই টেসকোকে এবং এনভায়রনমেন্টকে সাহায্য করে, কারণ আমরা না কিনলে এই খাবারগুলো রাতের মধ্যেই আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়ে পৃথিবীর জঞ্জাল বাড়াবে।

আমার নিজের এই সাশ্রয়ী বাজার আমার মাসিক সংসার-খরচের বাজেটকে সাহায্য করার পাশাপাশি অন্যদের বিপদে আমার সাহায্য করার ক্ষমতাকেও বৃদ্ধি করে। তাই আমি এ নিয়ে মোটেই লজ্জিত নই বরং অন্যদেরকেও উপদেশ দেব ঘরের পাশাপাশি যদি কোনো টেসকো স্টোর থাকে এবং সন্ধ্যার দিকে ফ্রি থাকেন, তাহলে সস্তায় বাজার করে টাকা বাঁচান। এভাবে মাসে শুধু খাবার খরচে ৫০ থেকে ১০০ পাউন্ড বাঁচানো সম্ভব। নিজের বাজারে সাশ্রয়ী হয়ে অন্যের বিপদে আশ্রয় হতে পারেন আপনিও। এই টাকায় বাংলাদেশে দশটি দরিদ্র শিশুর পড়ার খরচ দিতে পারবেন আপনি। তাহলে কেন নয়?

জেসমিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক