বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
সেপ্টেম্বর মাসে জন্ম নেয়া বাংলা সাহিত্যের চার জ্যোতিষ্ক

সাহিত্য  বলা হয় মানব ও সমাজ জীবনের প্রতিচ্ছবি। মানবজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাহিত্যের বিকাশ ঘটে।আমাদের বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন খ্যাতিমান সাহিত্যিকের সৃজনশীল ও অর্থপূর্ণ লেখায়। জ্ঞানী ব্যক্তিদের নানা সময়ে আগমন ঘটে, বছরের নানা মাসে অনেক জ্ঞানী গুণীর জন্ম হয়েছে তেমনি সেপ্টেম্বর মাসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেক জ্ঞানী সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন এই মাসে।

তাদের মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪), সৈয়দ মুজতবা আলী (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০৪), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সেপ্টেম্বর মাসে জন্ম নেয়া উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্কের ন্যায় চার কীর্তিমান সাহিত্যিকদের নিয়ে লিখেছেন সুব্রত রায়

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

জীবনের বহিরঙ্গ চিত্রণে, চরিত্রবিবর্তন রূপায়ণে ও সংলাপ রচনায় সম্পূর্ণরূপে বাস্তবানুগ সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুরাতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিলো যশোর জেলার ইছামতী নদীতীরস্থ ব্যারাকপুর গ্রামে।পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা মৃণালিনী দেবীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। মানুষের সুখ দুঃখের পাঁচালী ই তাঁর সাহিত্যের সর্বপ্রধান উপজীব্য। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মামা উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘ বিচিত্রা ‘ পত্রিকায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে তাঁর জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ে।অপরাজিতা, আরণ্যক,বিপিনের সংসার,অনুবর্তন,অথৈ জল,অশনি সংকেত,ইত্যাদি তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।বেশকিছু ভ্রমণকাহিনীও তিনি রচনা করেছেন।অভিযাত্রিক,স্মৃতির রেখা,ঊর্মিমুখর,হে অরণ্য কথা কও,প্রভৃতি ভ্রমণকাহিনী রচনা করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।এই খ্যাতিমান সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১ নভেম্বর,১৯৫০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

সৈয়দ মুজতবা আলী

সরস মার্জিত বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ভারতের আসামের করিমগঞ্জ শহরে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী তৎকালীন সময়ে করিমগঞ্জ এ সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী ও মাতা আয়তুল মান্নান খাতুন এর সুযোগ্য পুত্র সৈয়দ মুজতবা আলীর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার সদর উপজেলাতে।তাঁর বিপুল সংখ্যক রচনার মধ্যে রয়েছে উপন্যাস,ভ্রমণকাহিনী, সাহিত্য -সমালোচনা, প্রবন্ধ, প্রভৃতি।দেশে বিদেশে,চাচা কাহিনি, পঞ্চতন্ত্র,ময়ূরকণ্ঠী, ধূপছায়া,অবিশ্বাস্য, শবনম,টুনিমেম ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।রবীন্দ্র সাহিত্যের একজন নিষ্টাবান অনুরাগী ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী।আরবি,ফারসি,উর্দু,হিন্দি,সংস্কৃত,গুজরাতি,ইংরেজি, ফরাসি,ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।এই খ্যাতিমান সাহিত্যিক ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্য জগতের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ভারতের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতা ভুবনমোহিনী দেবীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান।বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার কারণে তিনি ‘ অপরাজেয় কথাশিল্পী ‘ নামে খ্যাত।তিনি ৭ টি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সাহিত্য রচনা করেছেন(অনিলা দেবী,অপরাজিতা দেবী,শ্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুরূপ দেবী,পরশুরাম,শ্রীকান্ত শর্মা,সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়)।তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ও আত্নজৈবনিক উপন্যাস শ্রীকান্ত(৪ খন্ড)।বড়দিদি,গৃহদাহ,চরিত্রহীন, দেবদাস,পথের দাবী,শেষ প্রশ্ন,পরিণীতা, বিরাজ বৌ,ইত্যাদি তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তাঁর রচিত ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে মন্দির,রামের সুমতি,বিন্দুর ছেলে,মেজদিদি,মহেশ, প্রভৃতি।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভগবতী দেবীর পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৯ সালে কলকাতা সংস্কৃত কলেজ থেকে তাঁর অসামান্য পান্ডিত্যের জন্য বিদ্যাসাগর উপাধি পান মাত্র ১৯ বছর বয়সে।তিনি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামে স্বাক্ষর করতেন।বাংলায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।পাশাপাশি সমাজ সংস্কারমূলক কাজে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ২৬ জুলাই ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইনে পরিণত হয়।মানবতাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সমাজসেবায় আত্ননিয়োগ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক গ্রন্থ ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ তাঁর রচিত যা বাংলা গদ্যসাহিত্যে প্রথম শোকগাঁথা।’বিদ্যাসাগর চরিত’ বাংলা গদ্যের প্রথম আত্নচরিত।তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বেতালপঞ্চবিংশতি,শকুন্তলা, সীতার বনবাস,ভ্রান্তিবিলাস, ইত্যাদি।১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর জীবনাবসান হয়।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অবদান অতুলনীয়।