প্রান্ত-জয়ের ছবি ও গল্পে
‘মায়ের মাঝেই দেবী বন্দনা’

ছবির গল্প: দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে পালন করা হচ্ছে এই উৎসব।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে “শারদীয় দুর্গাপূজা” আয়োজন করে দেবীকে আহ্বান করা হয়। চৈত্র মাসে মা পূজিত হোন ‘বাসন্তী’ রূপে। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি।

যে মাতৃশক্তির আরাধনাহেতু এই বিশাল আয়োজন, সেই “মা” যে আমাদের মাঝে সর্বদাই বিরাজমান। কেবল নির্দিষ্ট কোনো তিথীতে নয়, মা দুর্গা আমাদের চারপাশেই রয়েছেন, নানা রূপে, নানা নামে। সর্বস্তরের সকল নারীদের মাঝেই মা দুর্গার রূপ ও শক্তি প্রকাশিত হয়। তাই খুব সাধারণভাবেই মর্ত্যের “মা দুর্গাদের” স্বরূপ নিয়ে আমাদের এই মাতৃ আরাধনা।

প্রান্ত দে এবং জয় দেবনাথের ফটগ্রাফিতে ভেসে উঠেছে ছবির গল্প ‘মায়ের মাঝেই দেবী বন্দনা ২০১৯’। ছবির গল্পে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন অনুসূয়া দত্ত চৌধুরী মৌ এবং সুশীপ্তা দাশকে।

শরতের সাদা মেঘের ভেলা, আর সাদা কাশফুলে সজ্জিত প্রকৃতির অপরূপ রূপই সর্বপ্রথম জানান দেয় “মা আসছেন”।

মা আসছেন? না, মা আছেন। দেবী দুর্গার যেমন রূপের শেষ নেই, আমাদের মর্ত্যের দুর্গাদেরও তেমনি রয়েছে ভিন্নতা। আমাদের নারীরা কেউ কর্মজীবি আবার কেউবা গৃহিনী।

কর্মজীবি মায়েদের কিছু কাজের মূল্য হয়তো আমরা দিয়ে থাকি।

কিন্তু গৃহিনীদের কাজের কোনো মূল্য নির্ধারণ করাই সম্ভব হয়নি

দেবী যেমন তার অন্নপূর্ণা রূপে অন্ন তুলে দেন। আমার মায়েরাও যে যার মতো করে অন্নের যোগান দিয়ে থাকেন।

নিজের অজান্তেই তারা হয়ে ওঠেন “অন্নপূর্ণা”।

“দেবী মহালক্ষ্মী”র মতো মর্ত্যের লক্ষ্মী’রাও ঘরকন্যার সকল কাজ একা হাতে সামলে নেন।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র‍্যের কারণেই, আমরা দেবীর এই “মহালক্ষ্মী” রূপ আমাদের মায়েদের মাঝে দেখতে পাইনা।

 

“দেবী সতীর” পতিব্রতা রূপের কথা আমরা সকলেই জানি। সেই পতিব্রতা নারীরা কি আজও আমাদের মাঝেই বিরাজিত নন? এই ধর্ম আমাদের মায়েরা পালন করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।

আমাদের কর্মজীবি দুর্গারা সকল দায়িত্ব একা হাতে সামলে থাকেন। স্বামীর প্রতিও তাদের দায়িত্বের নেই কোনো অবহেলা।

“মাতৃরূপেন সংস্থিতা”। দেবীতো জগৎজননী। জগতের সকল সৃষ্টির মধ্যেই তিনি মাতৃরূপে বিরাজিতা। নারীর সকল রূপের মধ্যেও শ্রেষ্ঠতম রূপ এই মাতৃরূপ। এই রূপে মা কখনো কোমল, কখনোবা কঠোর। “দেবী পার্বতী”র মতোই আমাদের মায়েরা সন্তানদের আগলে রাখেন।

পরম মমতাময়ী এই মায়েরাই সন্তানের শ্রেষ্ঠ গুরু, শ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং শ্রেষ্ঠতম আত্মীয়। আত্মার সাথে সম্পৃক্ত সেই মাকে নমস্কার, নমস্কার এবং বারংবার নমস্কার জানাই।

দেবী অসুর বধতো করেছিলেন, কিন্তু মানুষরূপী অসুরদের হাত থেকে আজও দুর্গারা রেহাই পান না।

তাই প্রয়োজনে আজও কোমল রূপ থেকে “কালী” রূপ ধারণ করতে বাধ্য হোন নারীরা।

কিন্তু সকল দুর্গাই কি জিতে যান অসুরদের সাথে? না, আজও কিছু দূর্গারা ” কালী ” হয়ে উঠতে পারেননা।

তাই মুখ বুজে সহ্য করে যান অপমান আর অসম্মান। জড়তা এবং চক্ষুলজ্জার ফলে তাদের আর প্রতিবাদ করা হয়ে ওঠে না।

মাঝে মাঝে ওদের ভীষন মন খারাপ হয়।

কেউ তাদের মন খারাপের খবর রাখেনা।

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার শেষে গৃহস্থ বাড়ির মায়েরা সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর জোগাড়যন্ত্র করেন

তুলসী তলায় প্রদীপ প্রজ্বলন এবং সকলের মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে তারা সন্ধ্যার প্রার্থনা করে থাকেন।

অপরদিকে কর্মজীবি মায়েদের তখন থাকে ঘরে ফেরার তাড়া। একটি ব্যস্ততম দিন শেষে তারা তাদের শান্তির নীড়ে ফিরতে চান একটুকরো শান্তির নিঃশ্বাস নেবার আশায়। এভাবেই দিনের পর দিন বিভিন্নস্তরের নারীরা তাদের সাধারণ জীবনযাপণ করে থাকেন। আর এই সাধারণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসাধারণত্ব।

যা হোক, শারদোৎসবের অপেক্ষায় অন্য সকলের মতো নারীরাও মেতে থাকতে চান। সারা বছর ধরে “দুর্গা মা” এর আগমনীর দিন তারাও গুনতে থাকেন।

দেবীমা’কে বরণ করে নিতে এই মায়েরাও নতুন পোশাক পড়ে নতুন রূপে সাজতে চান।

প্রকৃতিতে শরৎ এলেই মায়ের আগমনী গান বেজে ওঠে। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় পূর্নতা পায় মায়ের প্রতিমা। আমাদের দুর্গাও তেমনি সেজে ওঠেন আপন রঙে।

কর্মব্যস্ত নারীর মাঝেও জেগে ওঠেন “মা”। আপন মহিমায় নিজেকে সাজিয়ে তোলেন পরম যত্নে।

শারদ উৎসবে সেজে ওঠে চারিদিক। মায়ের আঙিনায় মিলিত হন সর্বস্তরের মায়েরা। জাতপাত, ধনী-গরীব সবকিছুর উর্ধ্বে ফুটে ওঠে মায়ের মাহাত্ম্য।ষষ্ঠীতে হয় মায়ের বোধন। সপ্তমী থেকে নবমী চলে মায়ের আরাধনা। দশমীতে হয় বিসর্জন।

মায়ের আঙ্গিনায় সেদিন যেনো মর্ত্যের দুর্গাদের মিলনমেলা চলে।

সিঁদুর খেলায় সেদিন মেতে ওঠেন মা।

সিঁদুরের লাল রঙে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠেন আমাদের দুর্গারাও।

আমরা মা ভবতারিণীর আরাধনায় তো মেতে থাকি কিন্তু এই দুর্গাই যে সকল ঘরে ঘরে “মা” রূপে বিরাজ করেন।

দেবী দুর্গার মতো তাদের দশটি হাত আমাদের সম্মুখে না থাকলে ও তারাও দশভূজার শক্তি ধারণ করে থাকেন।

দুই হাতেই এই মায়েরা দশ হাতের কাজ করে থাকেন। এই মায়েদের মাঝেই “মা দুর্গার” রূপ ফুঁটে ওঠে।

এক “দুর্গা”ই বিভিন্ন রূপে আমাদের সাধারণ মায়েদের মাঝেই মিলেমিশে একাকার।

দুর্গার সকল রূপের সংমিশ্রণেই এক একজন মায়ের সৃষ্টি। হয়তো তাদেরকে দেবীর মর্যাদা আমরা দিতে পারিনা। কিন্তু তারা দেবীর চেয়ে কোন অংশেই কম নন।

দেবী দুর্গা কেবল প্রতিমাতে নন, বরং প্রতি “মা” তেই তিনি রয়েছেন মাতৃরূপে, শক্তিরূপে।

আইনিউজ/এসডি