বিকুল চক্রবর্তী, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রাচীণ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বড়লেখার তরল সোনার কঠিন সময় অতিবাহিত

প্রায় তিনশত বছর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সহস্রাধিক পরিবার ধরে রেখেছেন আগর আতর এর ব্যবসা। মুলত এই সহস্রাধিক পরিবার এটি ধরে রাখলেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সাথে সম্পৃক্ত অন্তত অর্ধলক্ষ মানুষ।
তবে বড়লেখায় আগর ব্যবহারের ইতিহাস অতি প্রাচীন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বই থেকে ও বন বিভাগের একটি প্রকাশনা থেকে জানাযায়, হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৬ থেকে ৬৪৬ সাল পর্যন্ত) কামরুপরাজ ভাস্কর বরমর্নের নিকট থেকে আগর আতর উপহার পেয়েছিলেন তা সিলেটের বড়লেখা থেকে সংগৃহিত। যা উল্লেখ রয়েছে ঐতিহাসিক হর্ষচরিত বইয়ে। তারও আগে তেত্রাযুগে ভগবান রামচন্দ্রের সময়ে এর ব্যবহার হয় উল্লেখ রয়েছে প্রবীত্র গন্থ রামায়নে। তবে বড়লেখায় এর বিষদ ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় প্রায় সাতশত বছর পূর্বে সিলেটে হযতর শাহ জালাল (র.) এর আগমনের পর।
বড়লেখার প্রবীণ আগর ব্যবসায়ী মো: আলা বক্স জানান, হযরত শাহ জালাল (র.) এর সাথে আগত ৩৬০ আউলিয়ার এক আউলিয়া দরিয়া পীর আস্তানা করেন বড়লেখায়। তিনি বড়লেখার পাথারিয়া পাহাড় থেকে আগর গাছ সংগ্রহ করে আগুনে জ্বালিয়ে সু-গন্ধ নিতেন। ওই সময় থেকেই বড়লেখার আগরের সাথে ব্যপক পরিচিত হন স্থানীয় অধিবাসী। একই সাথে তারা এর ব্যবহার সম্পর্কে বিশদভাবে ধারনা পান। কালক্রমে তারা এর বানিজ্যিক চিন্তাধারা করেন এবং এর সম্পর্কে ব্যাবপকভাবে জানার চেষ্টা করেন।
তখন তারা জানতে পারেন এর বাজার মুলত আরবদেশ মিশরীয় এলাকা। কিন্তু সে সময় বড়লেখা থেকে আরবে আগরের ব্যবসা দুরহ ছিলো। তারা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন আরবীরা তা পাকিস্তানের করাচি থেকে এসে সংগ্রহ করেন। তবে মাঝেমধ্যে আরব থেকে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে আরব সওদাগররা বড়লেখায়ও আসতেন। কিন্তু এর নিশ্চয়তা কম থাকায় বড়লেখার আগর ব্যবসায়ীরা বেঁচেনেন করাচিকেই।
শুরু হয় করাচী কেন্দ্রিক আগর সাপ্লাই। এর চাহিদা এতো বাড়ে যে স্থানীয় গাছের মাধ্যমে তারা কুলিয়ে উঠতে না পেরে ভারত উপমহাদেশের আসাম, নাগাল্যান্ড থেকে আগর গাছ সংগ্রহ করে কখনো আসামে কখনো নিজ এলাকায় এনে প্রসেসিং করে আতর করাচীতে নিয়ে বিক্রি করতেন। বানিজ্যিক চিন্তা নিয়ে বিট্রিশ আমলেই বন বিভাগ আগরের বাগান সৃজিত করে। বড়লেখার অনেক ব্যবসায়ী আসামে আগরের মহাল রাখতেন।
বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: কবির আহমদ চৌধুরী জানান, তারা পুরাতন কাগজ খোঁজতে গিয়ে দেড়শত বছর পূর্বের আগর মহালের কাগজ পেয়েছেন। বিট্রিশ আমলে করাচিতে আগরের চালান প্রেরনের রশিদ পেয়েছেন। তিনি জানান, তাদের পূর্বপুরুষ বিট্রিশ, বিট্রিশ পূর্ব সময়, পাকিস্তান আমলে করাচিতে নিয়েই তা বিক্রি করতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর তারা বড় বাজার পান ভারতের মুম্বাইয়ে। এখনও তারা মুম্বাইয়ে মাল প্রেরণ করেন। তবে এখন ৯০ ভাগ বাজারই মধ্যপ্রাচ্যে।
বিপুল সম্ভাবনাময় একটি শিল্প স্থানীয়রা শত শত বছর ধরে ধরে রাখলেও এখানে গড়ে উঠেনি আগর আতর থেকে পারফিউম তৈরীর প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি। রয়েছে গ্যাস, পূঁজি ও যোগাযোগ সমস্যাসহ বহি:বিশ্বে বিপনন, সাইটিস ও অনাপত্তি সনদ প্রাপ্তিতে দীর্ঘ সুত্রিতা। এদিকে এ শিল্পের উন্নয়নে মৌলভীবাজারে আগর আতর শিল্প পার্ক স্থাপনের সিন্ধান্ত গ্রহন করা হলেও এখনো তা দেখেনি আলোর মূখ। অতচ বিশ্ব ব্যাপী চাহিদা সম্পন্ন সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে কাজে লাগিয়ে সরকার বছরে অর্জন করতে পারে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। যা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে আমাদের জিডিপি বৃদ্ধিতেও।
বড়লেখার এ আগর আতরে এমটিতেই নানা সমস্যা। তার উপর এবছর করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে স্থবিরতা নেমে এসেছে ঐতিহ্যবাহী এ সুগন্ধি শিল্পে।
এ সংকটে উৎপাদন হওয়া পণ্য বিক্রি না হওয়ায় বড় কারাখানাগুলোর কার্যক্রম অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ছে। শ্রমিকদের বেতনভাতা ও নতুন করে ছোট ছোট বাগানীদের কাছ থেকে গাছ ক্রয়ও করতে। বড়লেখা আগরের রাজধানী হলেও বর্তমানে তা পুরো জেলাই ছড়িয়েছে। স্থানীয় জন সাধারণের পাশাপাশি সরকারের বন বিভাগও এখন অনেক গুলো আগর বাগান করেছে।
আগর আতরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন মৌলভীবাজারের অন্তত অর্ধ লক্ষ মানুষ। বন বিভাগের তথ্যমতে, নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ১৭৬টি হলেও এর সংখ্যা দ্বিগুন হবে।
বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনসারুল হক আরো জানান, এ শিল্পের উজ্জ্বল ভবিষত রয়েছে। এ শিল্পে সরকার নজর দিলে গামেন্টস শিল্পের চেয়ে অধিক জিডিপি আসবে। তিনি জানান, প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে এ পেশায় মৌলভীবাজার অর্ধলক্ষাধিক লোক জড়িত। অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা সমিতির আওতায় আসতে পারেননি। তবে যারা মোটামুটি বৃহতভাবে এ ব্যবসায় জড়িত এমন ১০৪জনকে নিয়ে একটি এসোসিয়েশন গঠন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৭০ জনের মতো আয়কর ও ভ্যাটের আওতায় এসেছেন।
তিনি আরো জানান, পূর্বে পিতলের ডেগে আগর কাঠ জ্বাল দিয়ে আতর বের করতেন। বর্তমানে তিনি ভারত থেকে ১০০ থেকে ৫শ লিটার পর্যন্ত ডেগ নিয়ে এসেছেন এ গুলো দিয়ে বড় পরিসরে ফেক্টরী করেছেন। সমিতির অনেককেই ডেগ এনে দিয়েছেন। পরে ভারত থেকে কারিগর এনে এখানে তৈরী করেন এবং তারাও তা তৈরী পদ্ধতি রক্ত করেছেন। বর্তমানে দেশেই তৈরী হচ্ছে বড় বড় ডেগ। এটি এ পেশাকে বৃহতভাবে সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বড়লেখার বিশিষ্ট আগর আতর ব্যবসায়ী সিতাব বক্স জানান, বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে আগর আতরের সর্বাধিক কারখানার অবস্থান। এখান থেকে উৎপাদিত শত কোটি টাকার আতর প্রতিবছর পাঠানো হয় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে প্রতি বছর কি পরিমাণ আতর বিদেশে রপ্তানি হয়, তার সঠিক কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে নেই। মূলত দেশ থেকে বিদেশগামী ব্যক্তিদের মাধ্যমে লাগেজ পদ্ধতিতে আতরটি বেশি পাঠানো হয়। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ জানান, দেশের পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও দিন দিন চাহিদা বাড়ছে পণ্যটির। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, ওমান, ইয়েমেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে আগর-আতর রফতানি হয়। কুয়েত, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের কয়েকটি আগর-আতর কারখানা রয়েছে, যেখানে কাঁচামাল যেত মৌলভীবাজার থেকে। শুধু জেলার বড়লেখাতেই বছরে আগরের নির্যাস হাজার লিটারের উপরে উৎপাদিত হয়।
তিনি জানান, তাদের সংগৃহিত তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বৈধ ও লাগেজ পথে জেলা থেকে সাত হাজার লিটার আতর বিদেশে পাঠানো হয়েছে। প্রতি লিটারের গড় দাম ছয় লাখ টাকা হিসেবে যার বাজার মূল্য প্রায় ৪শত কোটি টাকার উপরে। অন্যদিকে, আগর কাঠ রপ্তানি হয় আরো প্রায় ১৫/২০ হাজার কেজি। যার বাজার মূল্য প্রায় ২ থেকে ৩শত কোটি টাকা। মাঝের দুই বছর করোনার জন্য ব্যবসা হয়নি। বর্তমানে বছরে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
সুত্র জানায়, বছরে আগর আতর থেকে ৭/৮শত কোটি টাকার লেনদেন হয়। সরকার এটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন করলে একদিকে রাজস্ব বারবে অন্যদিকে এ শিল্পের বিকাশে এই এলাকার মানুষের জীবনমারে উন্নয়ন সাধিত হবে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারস এর নেতা ইসহাকুল হোসেন সুইট জানান, এ শিল্পে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমন রয়েছে অনেক সমস্যাও। তিনি জানান, প্রথমত এ অঞ্চলে আগর শিল্প সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে গ্যাস সংযোগ নিয়ে। শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কাঠ পুড়িয়ে ও সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে তারা উৎপাদন অভ্যাহত রেখেছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। একই সাথে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব ও সরকারি পৃষ্টপোষকতা না থাকায় বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে আতর উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করতে পারছেনা।
সরাসরি আতর থেকে পারপিউম দেশে তৈরী হচ্ছেনা। যা আমাদের কাঁচা মাল দিয়ে উন্নত রাষ্ট করে থাকে। এছাড়া আগর রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো সাইটিস (কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা) ও এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ) সনদ পাওয়া। এ সকল শর্তের বেড়াজালে অনেক আতর ব্যবসায়ী আটকা পড়েন। ফলে অনেকে বাধ্য হচ্ছেন চোরাই পথে আতর রপ্তানি করতে। তাই এটি আরো সহজ করা প্রয়োজন।
এ ব্যপারে ঢাকার ব্যবসায়ী জিয়া হায়দার মিঠু জানান, বড়লেখার আগর আতরের কাঁচামালকে সামনে রেখে তিনি মৌলভীবাজার বিসিক শিল্প নগরীতে অত্যাধুনিক আগর আতরের ফেক্টরী করেছেন। দেশের এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে ধরে রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তার মুল উদ্দেশ্য। তিনি প্রথম দফায় কার্যক্রম শুরু করে উন্নতমানের অতর পেয়েছেন। তার এ প্রতিষ্টানে বেশ কিছু লোককে কর্ম সংস্থানও দিতে পেরেছেন।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, এটি শুধু বড়লেখা নয় দেশেরই একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। যে সকল শিল্প রপ্তানীযোগ্য সরকার সে গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যে একাধিক বৈঠক ও সরজমিনে ব্যবসায়ীদের যে সকল প্রতিবন্ধকতা পরিদর্শন করা হয়েছে সেগুলো সমাধানের বিষয়েও সরকার গুরুত্বসহাকারে কাজ করছে।
আইনিউজ/বিকুল চক্রবর্তী/এমজিএম
আইনিউজ ভিডিও
নয় বছরের মেয়েটি কিভাবে নেভায় একের পর এক আগুন?
ঐতিহ্যবাহী আলী আমজাদ স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা
বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়ে অন্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষিপ্রগতি দেখে সবাই মুগ্ধ
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার
- বিজ্ঞাপন
মৌলভীবাজারে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় লাইফ লাইন হাসপাতাল (ভিডিও) - মৌলভীবাজারে ট্যুরিস্ট বাসের উদ্বোধন বৃহস্পতিবার
- ১ ঘন্টার জন্য মৌলভীবাজারে শিশু কর্মকর্তা হলেন তুলনা ধর তুষ্টি
- মৌলভীবাজার শহরে একদিনে ৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত
- বন্ধ থাকবে মৌলভীবাজারের ‘এমবি’